একজন প্রকৌশলী হিসেবে রেলওয়েতে কর্মজীবন শুরু। এরপর মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পের নেতৃত্ব, প্রশাসনিক দায়িত্ব—ধাপে ধাপে এগিয়ে আজ বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক। প্রকৌশলী মোঃ আফজাল হোসেনের কর্মজীবনের গল্পটা মূলত রেলওয়ের সঙ্গেই বেড়ে ওঠার গল্প।
১৯৯৪ সালের ২৫ এপ্রিল বাংলাদেশ রেলওয়ের সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন আফজাল হোসেন। ১৩তম বিসিএসের রেলওয়ে প্রকৌশল ক্যাডারের এই কর্মকর্তা চাকরির শুরু থেকেই রেলপথ, অবকাঠামো ও প্রকৌশল-সংক্রান্ত বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে রেলওয়ের বাস্তব সমস্যা, সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাবনাকে কাছ থেকে দেখেছেন তিনি।
সময়ের সঙ্গে দায়িত্বও বেড়েছে। রেলওয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করার পাশাপাশি বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায় পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প। দেশের অন্যতম বৃহৎ এই অবকাঠামো প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। রাজধানীর সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রেল যোগাযোগ স্থাপনের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে তাঁর দায়িত্ব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের দায়িত্ব পালনের পর বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ফলে রেলওয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা আরও বিস্তৃত হয়।
এরপর আসে কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন প্রকৌশলী মোঃ আফজাল হোসেন। যে প্রতিষ্ঠানে একজন সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের শুরু, দীর্ঘ ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা শেষে সেই প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে দায়িত্ব নেওয়া নিঃসন্দেহে তাঁর পেশাগত জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
বাংলাদেশ রেলওয়ে এখন বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যাত্রীসেবার মান বাড়ানো, ট্রেন চলাচলে নিরাপত্তা ও সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করা, পুরোনো অবকাঠামো আধুনিকায়ন, নতুন রেলপথ নির্মাণ, পণ্য পরিবহন বাড়ানো এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সময়মতো শেষ করা—সব মিলিয়ে চ্যালেঞ্জও কম নয়।
এই জায়গায় একজন দীর্ঘদিনের রেলওয়ে প্রকৌশলীর অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ রেলওয়ের অনেক সমস্যাই কাগজে-কলমে যতটা সহজ, বাস্তবে ততটা নয়। মাঠপর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকলে সেই বাস্তবতা বোঝার সুযোগ তৈরি হয়। আফজাল হোসেনের দীর্ঘ কর্মজীবনে রেলওয়ের বিভিন্ন স্তরে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে—এটিই তাঁর বর্তমান দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় শক্তি।
মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর রেলওয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমেও তাঁর উপস্থিতি দেখা গেছে। নতুন ট্রেন সার্ভিস চালু, রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং যাত্রীসেবাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন। এসব কার্যক্রমে রেলওয়ের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং যাত্রীদের প্রত্যাশার বিষয়গুলোও সামনে এসেছে।
তবে একজন কর্মকর্তার দীর্ঘ কর্মজীবনকে মূল্যায়ন করতে শুধু তাঁর পদবি কিংবা দায়িত্বের তালিকা যথেষ্ট নয়। তিনি কীভাবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁর অভিজ্ঞতা প্রতিষ্ঠানের কাজে কতটা ব্যবহার হচ্ছে এবং সাধারণ যাত্রীরা তার সুফল কতটা পাচ্ছেন—শেষ পর্যন্ত সেটিই বড় বিষয়।
আফজাল হোসেনের কর্মজীবনের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট—রেলওয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। একজন সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে শুরু করে মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব, বড় অবকাঠামো প্রকল্পের নেতৃত্ব, অতিরিক্ত মহাপরিচালকের দায়িত্ব এবং শেষ পর্যন্ত মহাপরিচালকের পদে আসা—এই পুরো যাত্রাটিই বাংলাদেশ রেলওয়েকে ঘিরে।
একজন রেলওয়ে কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা যেমন তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন, তেমনি প্রতিষ্ঠানটির জন্যও একটি সম্পদ। এখন সেই অভিজ্ঞতা কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
রেলওয়ের যাত্রীদের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়—নিরাপদ যাত্রা, সময়মতো ট্রেন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সহজসেবা এবং হয়রানিমুক্ত একটি ভ্রমণব্যবস্থা। পাশাপাশি রেলকে একটি দক্ষ, আধুনিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করাও সময়ের দাবি।
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোঃ আফজাল হোসেন সেই প্রত্যাশা পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন—এটাই রেলসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা। রেলওয়ে আরও আধুনিক হোক, নিরাপদ হোক, সেবার মান বাড়ুক এবং সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতিষ্ঠান হিসেবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠুক—এই প্রত্যাশাই থাকুক সবার।