রেলের ডিজিকে ঘিরে অপপ্রচারের অভিযোগ, নেপথ্যে দুদকের মামলার আসামিরা

১২৫ লাগেজ ভ্যান কেনায় ৩৫৮ কোটি টাকা ক্ষতির অভিযোগ—মাহবুবের বিরুদ্ধে চার্জশিটের সিদ্ধান্ত; ডিজিকে সরাতে স্বার্থান্বেষী মহলের তৎপরতার অভিযোগ

বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেনকে ঘিরে সাম্প্রতিক অপপ্রচার ও তাকে প্রশাসনিকভাবে চাপে ফেলার প্রচেষ্টার নেপথ্যে রেলের সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা ও স্বার্থান্বেষী মহলের তৎপরতা রয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, রেলে চলমান সংস্কার, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে পরিবর্তনের উদ্যোগে ক্ষুব্ধ একটি চক্র ডিজির বিরুদ্ধে বিভিন্ন মাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে।

অভিযোগের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রেলের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) প্রকৌশলী আহমেদ মাহবুব চৌধুরীর নামও সামনে এসেছে। ১২৫টি লাগেজ ভ্যান কেনাকাটায় রাষ্ট্রের প্রায় ৩৫৮ কোটি টাকা ক্ষতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় তিনি অন্যতম আসামি। এ মামলায় তার বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

১২৫ লাগেজ ভ্যান কেনায় বিপুল ক্ষতির অভিযোগ

দুদকের মামলার এজাহার ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ রেলওয়ের ‘রোলিং স্টক অপারেশনস ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’-এর আওতায় ৭৫টি মিটারগেজ ও ৫০টি ব্রডগেজ—মোট ১২৫টি লাগেজ ভ্যান কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

দুদকের অভিযোগ, প্রকল্পটি প্রণয়ন ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই, বাজারমূল্যায়ন এবং প্রকৃত চাহিদা বিশ্লেষণ করা হয়নি। বরং প্রকল্পটিকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হিসেবে উপস্থাপনের জন্য ভবিষ্যৎ আয় ও মুনাফার বিষয়ে অবাস্তব প্রাক্কলন দেখানো হয়েছিল। তদন্তে আরও অভিযোগ এসেছে, বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার এবং ‘ফরেন এনলিস্টমেন্ট’-এর নামে ভুয়া বা প্রশ্নবিদ্ধ কাগজপত্র ব্যবহার করে ক্রয়প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা হয়েছিল। দুদকের তদন্তে প্রকল্পের পরিকল্পনা, সম্ভাব্যতা যাচাই, দরপত্র প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হয়। এতে রাষ্ট্রের প্রায় ৩৫৮ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

মাহবুবের বিরুদ্ধে চার্জশিটের সিদ্ধান্ত

মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত শেষে প্রকৌশলী আহমেদ মাহবুব চৌধুরীর বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও জানানো হতে পারে বলে সূত্রটি দাবি করেছে। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, মাহবুব চৌধুরী সংশ্লিষ্ট সময়ে অতিরিক্ত প্রধান মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং ফিজিবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও ক্রয়প্রক্রিয়ার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্তে গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানা গেছে। দুদকের অভিযোগের মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—প্রকল্পের বাস্তব চাহিদা যথাযথভাবে নিরূপণ না করা, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে অসঙ্গতি, প্রকল্পের আর্থিক লাভের বিষয়ে অতিরঞ্জিত বা অবাস্তব তথ্য উপস্থাপন এবং ক্রয়প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশের অভিযোগ। মামলায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী নাবিল আহসানসহ অন্যদেরও আসামি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর দুদকের উপসহকারী পরিচালক হাবিবুর রহমান বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলাটির নম্বর ২৫ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রমজান আলীর বিরুদ্ধেও দুদকের মামলা

ডিজিকে ঘিরে অপপ্রচারের নেপথ্যে আরেকজন  রেলের সাবেক প্রকল্প পরিচালক মো. রমজান আলীর নামও উল্লেখ করা হচ্ছে। লাকসাম-আখাউড়া ডুয়াল গেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক রমজান আলী এবং তার স্ত্রী দিলরুবা পারভীনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে দুদকের দুটি মামলা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথির বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের বিষয়টি ওই মামলাগুলোর তদন্তে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নিজেদের বিরুদ্ধে চলমান মামলা ও প্রশাসনিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ একটি অংশ বর্তমান রেল প্রশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

ডিজিকে সরানোর চক্রান্তের অভিযোগ

রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্রের দাবি, বর্তমান ডিজি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনিক শৃঙ্খলা জোরদার, প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনা এবং বিভিন্ন বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় একটি মহল অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠে। এই অসন্তোষ থেকেই ডিজিকে বিতর্কিত করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে রেলের সাবেক কর্মকর্তা রমজান আলীর একপেশে বক্তব্যের ভিত্তিতে ডিজিকে নিয়ে সংবাদ প্রচার করা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তাদের অভিযোগ, সংবাদে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অন্য পক্ষের বক্তব্য যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

ডিজির বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন বলেন, রেলওয়ের চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম ও প্রশাসনিক গতিশীলতা ব্যাহত করতে একটি স্বার্থান্বেষী মহল তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তিনি বলেন, “রেলওয়েতে চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম ও প্রশাসনিক গতিশীলতা ব্যাহত করতেই একটি স্বার্থান্বেষী মহল আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে। যারা নিজেরা দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের দায়ে চাকরি হারিয়েছেন এবং দুদকের মামলার আসামি, তারাই মূলত নেপথ্যে রয়েছে। চক্রান্ত করে রেলের সংস্কার থামানো যাবে না।

অভিযোগ প্রমাণের দায়িত্ব আদালতের

বর্তমান ডিজির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে  নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা এবং ভিত্তিহীন হলে অপপ্রচারের দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা—দুই ক্ষেত্রেই একই মানদণ্ড অনুসরণ করা জরুরি।

রেলের স্বার্থে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত

 

বাংলাদেশ রেলওয়ের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে শত শত কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি একজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে সরাতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। ১২৫টি লাগেজ ভ্যান কেনার প্রকল্পে যদি সত্যিই ৩৫৮ কোটি টাকা ক্ষতির ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে প্রকল্প গ্রহণ থেকে শুরু করে সম্ভাব্যতা যাচাই, ডিপিপি প্রণয়ন, দরপত্র, মূল্য নির্ধারণ, অনুমোদন ও সরবরাহ—প্রতিটি ধাপে কার কী ভূমিকা ছিল, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

একই সঙ্গে বর্তমান ডিজিকে ঘিরে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। কোনো পক্ষের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব যাতে তদন্তকে প্রভাবিত করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের দাবি, ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে রেল প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে অপপ্রচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়াই হতে পারে এ বিতর্কের স্থায়ী সমাধান।

শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও বাংলাদেশ রেলওয়ের স্বার্থই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়ার কথা—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।