একজন সিএনজি চালক, এক কাপ চা, দশ মিনিটেই অচেতন, এরপর সিএনজি হাওয়া। গল্পটা যদিও এমনই, তবে নকশাটা কেমন?
চায়ের দোকানে আগে থেকেই ওত পেতে থাকে চোর চক্রের কয়েকজন। কোনো সিএনজি চালক এসে এক কাপ চা চাইলে, সঙ্গে সঙ্গে চায়ের অর্ডার দেন সেই চক্রের একজন। এরপর দোকানদার চা দেয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ভাড়া ঠিক করার ছলে সিএনজি চালককে ব্যস্ত রাখেন চক্রের অন্য সদস্য। আর এই সুযোগেই চায়ে মেশানো হয় চেতনানাশক। ব্যাস, মাত্র ১০ মিনিটেই অচেতন চালক, এরপর সিএনজিসহ চক্র গায়েব।
রাতের নিস্তব্ধতায় জনসমাগম কমলেই শুরু হয় এই চক্রের তৎপরতা। টার্গেট রাস্তার পাশের চায়ের টঙ দোকান, এছাড়াও রাজধানীর অলি-গলি। এমন সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে এরই মধ্যে দুই দুইবার সিএনজি হারিয়েছেন মাহাবুব নামের এই চালক।
সিএনজি হারানোর কথা স্মরণ করে মাহাবুব বলেন, ‘চা খাওয়ার পর লগে লগেই প্যাসেঞ্জার আসছে। প্যাসেঞ্জার নিয়ে যাইতে নিসি। তারপর আমি অজ্ঞান হয়ে গেছি। আমার গাড়ি চোরে নিয়ে গেছে। প্রথম একটা গাড়ি নেয়। ওই গাড়িটা আনতে আমার ১ লাখ টাকা লাগছে। ড্রাইভারের সঙ্গে দিয়া পলিটিক্স খাটায়, গাড়ি নিয়ে যায়।’
কিন্তু এই চক্রের মূল হোতা কে? শুনলে অবাক হতে হয়। এলাকায় তিনি পরিচিত দানবীর হিসেবে। মানুষের ভোটে হয়েছেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিও। নাম তার জামাল হোসেন, এলাকায় পরিচিত জামাল মেম্বার হিসেবে।
জামাল মেম্বারের বিষয়ে জানতে চাইলে মোড়েলগঞ্জের কয়েকজন গ্রামবাসী বলেন, ‘উনার দুইটা বিল্ডিং আছে। টাকা-পয়সা ইনকাম করে। আমরা শুনছি, গাড়ি ব্যবসা করে। সে অনেক সাহায্য করে। একটু না, বিশ-পঞ্চাশ হাজার টাকা সাহায্য দিয়ে দেয়। উনার শখ ছিল মেম্বার হবে, মেম্বার হইছে।’
তবে দিন পেরিয়ে রাত নামতেই খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন জামাল। মেম্বার থেকে হয়ে যান অজ্ঞান পার্টির দুর্ধর্ষ সর্দার। তবে ৬ সদস্যসহ সম্প্রতি গোয়েন্দাজালে ধরা পড়ে সে।
গোয়েন্দা তথ্য বলছে, রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকায় যত সিএনজি চুরি হয়, তার মূল হোতা তিনি। যা অকপটে স্বীকারও করেন তিনি।
সিএনজি ছিনতাইয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে চক্রের মূল হোতা ও ইউপি সদস্য জামাল হোসেন বলেন, ‘প্রতিটি সিএনজির জন্য সর্বনিম্ন চল্লিশ, সর্বোচ্চ পঞ্চাশ হাজার টাকা নিই। এর বেশি কেউ দেয় না। আজকে থেকে উনিশ-বিশ বছর আগে থেকেই এই ব্যবসাটা হইতেছে।’
আর আপনি কতদিন ধরে করছেন এই ব্যবসা—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি ১০-১৫ বছর ধরে করছি।’
তিনি আরও জানালেন, ১৫ বছর আগে একই কৌশলে চুরি হয় তার অটোরিকশা, যার হোতা ছিল কানা শহীদ গ্রুপ। এরপর সেই চক্রের সঙ্গে সখ্যতা, পরবর্তীতে নিজেই গড়ে তোলেন তার থেকেও বড় চক্র।
জামাল হোসেন আরও জানান, ‘একটা চা আর বেনসন সিগারেট দিতে হয় সবার আগে। এর মানে, কাজের আগেই দিতে হয় টাকা। যদি কাজ হয় তো হইল, আর না হলে খরচ আমার মাইর।’
জামাল মেম্বারের সহজ স্বীকারোক্তি, সিএনজি ছিনতাইয়ের টাকাই তিনি হয়েছেন জনপ্রতিনিধি।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখান থেকেই নিয়া ওইখানেই দিছি। এখান থেকে দিয়ে মানুষেরে দান করছি। আমার তো আর ইনকাম সোর্স নাই।’
গোয়েন্দারা বলছেন, অনেক সময় চেতনা হারানোর পাশাপাশি বড় ধরনের দুর্ঘটনাও ঘটে সিএনজি চালকদের।