অডিট আপত্তিকে দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে প্রচারের অভিযোগ, নেপথ্যে পদ দখলের প্রতিযোগিতার দাবি

রেলওয়ে ডিজির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে রেলওয়ের অভ্যন্তরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। সংশ্লিষ্টদের একাংশ এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তাদের অভিযোগ, সাধারণ প্রশাসনিক বা আর্থিক অডিট আপত্তিকে দুর্নীতির চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।

সংশ্লিষ্ট অডিট কর্মকর্তাদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের অডিটে আপত্তি ওঠা মানেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। অডিট আপত্তি মূলত কোনো আর্থিক লেনদেন, প্রক্রিয়াগত ত্রুটি, বিধিবিধান অনুসরণের ঘাটতি কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অসংগতি চিহ্নিত করতে পারে। এসব আপত্তির জবাব, নিষ্পত্তি এবং পরবর্তী যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়েই প্রকৃত অনিয়মের বিষয়টি নির্ধারিত হয়।

রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে যেসব অডিট আপত্তির কথা সামনে আনা হচ্ছে, সেগুলোর প্রকৃতি ও নিষ্পত্তির অবস্থাও জনসমক্ষে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। তাদের ভাষ্য, অডিট আপত্তিকে সরাসরি দুর্নীতির অভিযোগ হিসেবে প্রচার করা হলে তা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।

আফজাল হোসেনের কর্মদক্ষতা ও ব্যক্তিগত সততা নিয়েও রেলওয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার মধ্যে ইতিবাচক মত রয়েছে বলে দাবি করেছেন তার শুভাকাঙ্ক্ষীরা। তাদের বক্তব্য, দীর্ঘদিনের কর্মজীবনে তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ বা ব্যক্তিগতভাবে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে তা যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে সামনে আসা উচিত। তবে কেবল অভিযোগ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারের ভিত্তিতে কাউকে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করাও সমীচীন নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রেল কর্মকর্তা বলেন, রেলওয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সময়ে সময়ে নানা ধরনের অডিট আপত্তি ওঠে। ফলে শুধু অডিট আপত্তির অস্তিত্বকে দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হলে একই প্রশ্ন অনেক কর্মকর্তার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। তার মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নথিপত্র, তদন্তের ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য।

এদিকে, বর্তমান মহাপরিচালককে ঘিরে ওঠা অভিযোগের পেছনে প্রশাসনিক ও পদসংক্রান্ত স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে বলেও রেলওয়ের একটি অংশের অভিযোগ। তাদের দাবি, মহাপরিচালকের পদকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিযোগিতা রয়েছে। ফলে কাউকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তবে এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাকে ঘিরে অভিযোগ উঠলে তা যেমন গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন, তেমনি প্রমাণ ছাড়া কোনো কর্মকর্তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করাও কাম্য নয়।

রেল বিশ্লেষক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, একটি অধিদপ্তরের প্রধানকে ঘিরে অভ্যন্তরীণ বিরোধ বা পরস্পরকে হেয় করার প্রবণতা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাঠামোকে দুর্বল করতে পারে। তার মতে, ব্যক্তিগত বা পদসংক্রান্ত দ্বন্দ্বের পরিবর্তে রেলওয়ের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করে তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা উচিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রেলওয়ের মতো বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। একই সঙ্গে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রচার করাও বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগও থাকা দরকার।

সার্বিকভাবে, রেলওয়ে ডিজিকে ঘিরে সাম্প্রতিক অভিযোগের ক্ষেত্রে আবেগ বা অভ্যন্তরীণ বিরোধ নয়, বরং তথ্য-প্রমাণ ও প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তকেই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অডিট আপত্তির প্রকৃতি, তার জবাব ও নিষ্পত্তির অবস্থা এবং দুর্নীতির অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে কি না—এসব বিষয় স্বচ্ছভাবে যাচাই করা হলে প্রকৃত সত্য সামনে আসবে। একই সঙ্গে পদ দখল বা অভ্যন্তরীণ প্রভাব বিস্তারের জন্য কেউ অপপ্রচারে জড়িত থাকলে তদন্তসাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

রেলওয়ের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, চেইন অব কমান্ড এবং জনআস্থা অক্ষুণ্ন রাখতে তাই প্রয়োজন অভিযোগের যথাযথ তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা। এতে একদিকে যেমন দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের আওতায় আসবে, অন্যদিকে ভিত্তিহীন অভিযোগের মাধ্যমে কোনো কর্মকর্তাকে হয়রানি বা হেয় করার সুযোগও কমবে।