> তদন্তে ১৮ জনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও শাস্তি শুধু বেলাল- শাহনেওয়াজের—দাবি সংশ্লিষ্টদের
> ‘৩ বছরে ৪৫-৫০ কোটি টাকার বাজেটে ২০০ কোটি লুটের’ প্রচারণা নিয়ে প্রশ্ন
> সিসিএসের দায়িত্ব নেওয়ার পরও একের পর এক অভিযোগ, ষড়যন্ত্রের দাবি প্রকৌশলী বেলালের পক্ষের
বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন দপ্তরে টেন্ডার, ক্রয়প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে একাধিক অভিযোগ ও তদন্তের মধ্যে প্রকৌশলী বেলাল হোসেনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত নানা তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বেলালের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে আসছে। একই সঙ্গে কয়েকটি ঘটনায় তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়নে বৈষম্য করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে সব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, তদন্ত প্রতিবেদন এবং অভিযুক্ত অন্য কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
২০ লাখ টাকার টেন্ডার নিয়ে অডিট আপত্তি
বেলালের পক্ষ থেকে দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সিসিএম/পশ্চিম অফিসে প্রায় ২০ লাখ টাকার একটি টেন্ডারের মাধ্যমে ৯টি আইটেম কেনা হয়। এর মধ্যে প্রায় ২০০টি তালাও ছিল। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পিপিআর-২০০৮-এর বিধিবিধান অনুসরণ করেই ওই ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল। এরপরও বিষয়টি নিয়ে অডিট আপত্তি ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে, অডিট আপত্তিকে কেন্দ্র করে প্রথমে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। তদন্ত কমিটি গঠনের আগেই প্রকৌশলী বেলাল হোসেন, বগুড়ার এলডিএ আলামিন তালুকদার এবং এস এম শাহনেওয়াজকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় বলে বেলালের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
পরে গঠিত তদন্ত কমিটি ওই টেন্ডারসহ আরও কয়েকটি টেন্ডারের বিভিন্ন আইটেম নিয়ে তদন্ত করে। বেলালের পক্ষের দাবি, তদন্তে মোট ১৮ জনকে টেন্ডারে অনিয়মের জন্য দায়ী করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বাজার কমিটি, প্রাক্কলন কমিটি ও অনুমোদনকারী কর্মকর্তাদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও বেলাল হোসেন ও শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বেলালের পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে স্কেলের সর্বনিম্ন ধাপে নামিয়ে দেওয়া হয় এবং শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাদের দাবি, তদন্তে একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও নির্দিষ্ট কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তৈরি করে।
দুদকের এনফোর্সমেন্টেও একই অভিযোগ?
পরবর্তী সময়ে কাছাকাছি সময়ের আরও কয়েকটি টেন্ডার নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম হয় বলে বেলালের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, দুদকের এনফোর্সমেন্টের পর রেলওয়েকে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির বিরুদ্ধেও একই ধরনের বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। বেলালের পক্ষের দাবি, বাজার কমিটি, প্রাক্কলন কমিটি ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে শুধু দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুমোদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার দায়ে বেলাল হোসেনের এক বছরের বেতন বৃদ্ধি স্থগিত এবং এস এম শাহনেওয়াজকে নিম্ন পদে পদাবনতি দেওয়া হয়।
এ ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হচ্ছে—একই ক্রয়প্রক্রিয়ায় একাধিক কমিটির সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সবার দায় নির্ধারণে কি একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়েছিল? তদন্ত প্রতিবেদন ও শাস্তির আদেশ পর্যালোচনা করলেই এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব।
‘২০০ কোটি টাকা লুট করে কানাডায়’—প্রচারণা কতটা বাস্তব?
প্রকৌশলী বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো, তিনি পশ্চিমাঞ্চলের সিওএস হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে কানাডায় চলে গেছেন—এমন প্রচারণা।
বেলালের পক্ষের দাবি, ওই প্রচারণায় তাকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা লুটপাটের সঙ্গে জড়ানো হয়। অথচ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বার্ষিক বাজেটই ছিল আনুমানিক ১৫ কোটি টাকা। তিন বছর দায়িত্ব পালনকালে মোট বাজেটের পরিমাণ আনুমানিক ৪৫ কোটি টাকা, বড়জোর ৫০ কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে। ফলে ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের দাবির সঙ্গে দপ্তরের মোট বাজেটের তুলনাই প্রশ্ন তৈরি করে।
এছাড়া একজন সরকারি কর্মকর্তা সরকারি অনুমোদন বা প্রয়োজনীয় সরকারি আদেশ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে বিদেশে অবস্থান করতে পারেন কি না, সেটিও যাচাইযোগ্য বিষয়। বেলালের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাকে হেয় করার উদ্দেশ্যেই এ ধরনের প্রচারণা চালানো হয়েছিল।
সিসিএস পদে যোগদানের পর নতুন অভিযোগ
পরবর্তীতে বেলাল হোসেন সিসিএস পদে দায়িত্ব নেওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে নানা অভিযোগ ও প্রচারণা চালানো হয় বলে তার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
বেলালের দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিনের মধ্যেই ডিসিওএস/পরিদর্শন, পাহাড়তলী দপ্তরে বিপুল পরিমাণ ক্যাবল চুরির ঘটনা সামনে আসে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, প্রায় ৫৭ লাখ টাকা মূল্যের ক্যাবল চুরির অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
তবে বেলালের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, চুরি যাওয়া মালামালের প্রকৃত মূল্য আরও বেশি হতে পারে। এ বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য তদন্ত প্রতিবেদন বা সরকারি নথিতে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেলে সেটিই চূড়ান্ত ভিত্তি হওয়া উচিত।
তদন্ত কমিটি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত কর্মকর্তাদের বদলির সুপারিশ করেছিল বলে বেলালের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, ওই সুপারিশ বাস্তবায়নের পরিবর্তে প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী বিষয়টি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করে।
সিসিএস দপ্তরে আগুন: তদন্তের দাবি
সিসিএস দপ্তরে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড নিয়েও বেলালের পক্ষ থেকে গুরুতর সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের দাবি, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়; পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়ে থাকতে পারে।
তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে তদন্ত সংস্থার আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন ছাড়া এমন দাবি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। অগ্নিকাণ্ডটি দুর্ঘটনা, নাকি নাশকতা—তা নির্ধারণে ফায়ার সার্ভিস, রেলওয়ে ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
‘এক বছরে ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া’—প্রমাণ কোথায়?
বেলাল হোসেনকে সরানোর উদ্দেশ্যে একটি জাতীয় দৈনিকে তার বিরুদ্ধে এক বছরে ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে বলেও তার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
তাদের বক্তব্য, ওই সময়ে সিসিএস দপ্তরে প্রধানত আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক দরপত্রে বিদেশি ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ থাকায় দরপত্র প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ নথিভুক্ত থাকে এবং অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব।
তাই ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে শুধু প্রচারণা নয়, অর্থের উৎস, লেনদেনের হিসাব, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ক্রয় নথি, তদন্ত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রমাণ সামনে আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বেলালের পক্ষের ব্যক্তিরা।
প্রশ্ন উঠছে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে
বেলালের পক্ষের মূল অভিযোগ, একাধিক টেন্ডার ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় যদি অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সব কমিটি ও কর্মকর্তার ভূমিকা একইভাবে তদন্ত করা উচিত ছিল। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাকে অব্যাহতি দেওয়ার পাশাপাশি অন্য কারও বিরুদ্ধে শাস্তি দেওয়া হলে সেই সিদ্ধান্তের যুক্তি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
তাদের আরও দাবি, একই ধরনের ঘটনায় একেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে একেক ধরনের শাস্তি প্রয়োগ করা হলে প্রশাসনিক ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এদিকে বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে অডিট আপত্তি, তদন্ত প্রতিবেদন, দুদকের এনফোর্সমেন্ট সংক্রান্ত নথি, বিভাগীয় শাস্তির আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট ক্রয় নথি প্রকাশ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বেলালের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনকারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বক্তব্যও প্রকাশ করা হলে পাঠকের সামনে পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা সম্ভব হবে।
অভিযোগের পাশাপাশি জবাবদিহিও জরুরি
সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। একইভাবে কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শত কোটি টাকা আত্মসাৎ, বিদেশে অর্থ পাচার বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও সেগুলোর পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ থাকা জরুরি।
প্রকৌশলী বেলাল হোসেনের পক্ষ থেকে যেসব অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোরও স্বাধীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগগুলো সত্য হলে তার প্রমাণও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সামনে আনতে হবে।
রেলওয়ের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা বদলি, পদায়ন, শাস্তি কিংবা পদোন্নতি—কোনোটিই যেন ব্যক্তিগত প্রভাব, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব বা প্রচারণার ভিত্তিতে না হয়। প্রতিটি সিদ্ধান্ত হতে হবে নথি, তদন্ত ও বিধিবিধানের ভিত্তিতে।
অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ মিথ্যা হলে একজন কর্মকর্তার সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার দায়ও নির্ধারণ করা প্রয়োজন। প্রকৌশলী বেলাল হোসেনকে ঘিরে ওঠা বিতর্কের ক্ষেত্রেও তাই সবচেয়ে জরুরি হলো—অভিযোগ নয়, নথি ও নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে সত্য উদঘাটন।