যে ইলিশের জন্য দেশজুড়ে এতো হাহাকার এতো আলোচনা সেই জাতীয় মাছ এখন মূলত পদ্মা নদী নির্ভর। কিন্তু বিস্ময়কর তথ্য হলো মাত্র ৪-৫ দশক আগে চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যতম নদী কর্ণফুলিতে পাওয়া যেতো এই রূপালি রাজা মাছটি। কিন্তু নদী ও সমুদ্র সংশ্লিষ্ট নানা গবেষণা জানাচ্ছে, কর্ণফুলিতে শুধু ইলিশ নয় বিপন্নতার ঝুঁকিতে রয়েছে আরো ১৭ প্রজাতির দেশীয় মাছ। এজন্য দায় হলো দখল ও দূষণের কবলে পড়ে এককালের অপরূপা কর্ণফুলির বর্তমান বিপন্নতা।
দেশের মৎস্য সম্পদ ও নদী বিষয়ক মৌলিক গবেষণাগুলো জানাচ্ছে, ১৯৬০ এর দশকে কর্ণফুলী ছিল সত্যিকার অর্থেই প্রাচুর্যের নদী। এটি ছিলো বাংলাদেশের সমৃদ্ধ এক প্রাকৃতিক মৎস্যভাণ্ডার। কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের আগেও এই নদীর উজান ভাটিতে ছিলো বিপুল মাছের স্বাভাবিক বিচরণ। জেলেদের জালে নিয়মিত ধরা পড়তো ইলিশ, ভেটকি, কোরাল, বোয়াল, আইর, বাইন, পোয়া, পারশে, ট্যাংরা, চিংড়িসহ অসংখ্য প্রজাতির মাছ। বেশ ক’জন প্রবীণ জেলের দেয়া অভিন্ন তথ্যে জানা গেছে একসময় একটি মাঝারি নৌকা এক রাতে ৮০ থেকে ২০০ কেজি পর্যন্ত মাছ নিয়ে ফিরতো। কিন্তু ১৯৭০ এর দশকে এই চিত্র পাল্টাতে শুরু করে। স্পষ্ট হতে থাকে কাপ্তাই বাঁধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। ব্যাহত হতে শুরু করে বেশ কিছু পরিযায়ী মাছের প্রজনন ও চলাচল। কিন্তু তখনও কর্ণফুলি ছিলো বাণিজ্যিক মাছের অন্যতম সুদীর্ঘ প্রকৃতিক উৎস। ১৯৮০ এর দশকে চট্টগ্রামের শহর ও শিল্পাঞ্চল দ্রæত সম্প্রসারণ শুরু হলে এর ক্রমবর্ধমান চাপে কর্ণফুলী হারাতে শুরু করে তার চিরচঞ্চলা যৌবন। শিল্প ও নাগরিক বর্জ্য এসে পড়তে শুরু করে সরাসরি এই নদীতে। কমতে শুরু করে এখানে মাছের উৎপাদন তথা প্রজনন। তবুও তখনও জেলেরা হাসিমুখে ভালো পরিমাণ মাছ নিয়ে ডাঙায় ফিরতেন। দূষণের তীব্র রূপ ও এর প্রভাব দেখা যেতে শুরু করে ১৯৯০ দশকে। মূলত এই সময় থেকেই কর্ণফুলীর পানির গুণগত মান খারাপ হতে শুরু করে। ইলিশসহ আরো কয়েকটি মূল্যবান মাছের আনাগোনা- উপস্থিতি ব্যাপকভাবে কমে যায়। নদীটির বিভিন্ন অংশে জেলেদেরও আয় কমতে শুরু করে।
২০০০ থেকে ২০১০ সালই হলো কর্ণফুলী নদীর মরণকালের শুরু। এই একটি দশকেই দূষণ, দখল ও অন্যান্য কারণে প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কর্ণফুলীকে মাছেরা অপছন্দ করতে শুরু করে। গবেষকদের মতে, অপরিকল্পিত, অনিয়মিত ড্রেজিং এবং জাহাজ চলাচল বেড়ে যাওয়াও এর অন্যতম আরেকটি কারণ। এই সময় থেকেই এই নদী ও সংশ্লিষ্ট আশেপাশের নদীতে স্থানীয় মাছ আর আগের মতো ধরা পড়ছেনা। ২০১২- ২০১৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাটি করে। তাতে দেখা যায়, ঐতিহাসিক কালুরঘাট এলাকা থেকে নগর সংযুক্ত শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত অংশে মাত্র ২৪টি বাণিজ্যিক প্রজাতির মাছ নথিভুক্ত করা গেছে। এর সাথে পাওয়া যায় শেলফিস বা চিংড়ি প্রজাতির ৩টি মাছ। ২০২০ সালে করা দেশের নদীকেন্দ্রিক বৃহৎ জরিপটিতে উঠে আসে সবচেয়ে শঙ্কার চিত্র। চট্টগ্রামের সংযুক্ত মোট ৫টি নদীতে পরিচালিত ওই জরিপে জানা যায়, কর্ণফুলী নদীতে মোট ১২৮টি জলজ প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে। এরমধ্যে ১১০টি মাছ ও ১৮টি শেলফিস প্রজাতি। কিন্তু গবেষকরা ওই জরিপের ফলাফলেই সতর্কতা প্রকাশ করেন যে প্রাপ্ত ওইসকল প্রজাতির মধ্যে বেশ কিছু দেশীয় প্রজাতির মাছ বিরল, বিপন্ন এবং সংকটের মুখে। গবেষকদের ওই শঙ্কা বর্তমান ২০২৫-২৬ সালে এসে সত্য প্রমাণিত হতে যাচ্ছে। বর্তমানে দূষণ, দখল, নিক্ষিপ্ত ভারী ধাতু, প্লাস্টি বর্জ্য এবং নানা আধুনিক উপায়ে অতিরিক্ত মাছ আহরণের ফলে কর্ণফুলীর মৎস্য সম্পদ মারাত্মক চাপে রয়েছে। এই চাপের ফলে বর্তমানে কর্ণফুলী নদীতে কমপক্ষে ১৭টি দেশীয় প্রজাতির মাছ বিপন্নতার ঝুঁকিতে রয়েছে।
কর্ণফুলীর পাড়ে প্রায়শ অলস বসে থাকা জেলেদের মধ্যে প্রবীণ অনেক জেলেই বলেছেন, কোন কোন সময় গড়ে ১ রাতে পাওয়া যেতো গড়ে ৮০ থেকে ২০০ কেজি পর্যন্ত মাছ। যা মাঝে মাঝে ১০০ থেকে ৩০০ কেজিও ছাড়িয়ে যেতো এখন আর তেমন পাওয়া যায়না দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও। ফলে প্রায় সময় জেলেদের গভীর সমুদ্রে চলে যেতে হচ্ছে।
মৎস্যবিজ্ঞানীদের মতে, কর্ণফুলী নদীর স্বাভাবিক নাব্যতা রক্ষা, শিল্পবর্জ্য শোধন, নদী থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ এবং মাছের স্বাভাবিক প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ করা না গেলে দেশের অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নদীতে অচিরেই দেশীয় মাছের বৈচিত্র্য অথবা উপস্থিতি কমে যেতে পারে।
বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগের উপ পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) শ্রীবাস চন্দ্র চন্দ স্বীকার করেছেন কর্ণফুলী নদীতে ইলিশ প্রাপ্তির তথ্যের কথা। তিনিও জানালেন, প্রবীণ জেলেরা তাঁকে জানিয়েছেন, একসময় কর্ণফুলীতে মাছের রাজা ইলিশের দেখা পাওয়া যেতো। শুধু তাই নয়, এই মাছ রাঙ্গুনিয়া, কাপ্তাই অব্দিও পৌঁছে যেতো। তিনি এও স্বীকার করলেন, এর জন্য দায়ী এই নদীর প্রতি মানুষের স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়টি। তাঁর মতে, ইলিশ মাছ তার প্রজনের ক্ষেত্রে এতোটাই সংবেদনশীল যে, প্রজনন মৌসুমে সে তার অনুকুলের পরিবেশ যে নদীতে পাবেনা সেখানে সে মোটেও আসবেনা। অন্যান্য মাছেরাও অনেকটা একই প্রকৃতির। তিনি আরো বলেন, দখল ও দূষণ অব্যাহত রেখে মাছেদের তো ডিম পাড়া বা বিচরণের জন্য ডেকে আনা সম্ভব নয়। এরজন্য একমাত্র প্রয়োজন যে কোন উপায়ে কর্ণফুলীকে দখল ও দূষণমুক্ত করে এর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা। এজন্য সকল উদ্যোগই নিতে হবে। অন্যথায় এই নদী বাচাঁনো সম্ভব হবে না। কারণ কোন নদীতে মাছের বেঁচে থাকার পরিবেশ না থাকা মানেই সেই নদীও মরে যাওয়া।