মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বন বিভাগের পরিচালিত আইনানুগ উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন বনভূমি পুনরুদ্ধারের কার্যক্রম চলছে, অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অসত্য তথ্য প্রচারকে ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বন ভিলেজারদের রেষারেষি এবং প্রকৃত তথ্য আড়াল করতে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী ভূমি জবরদখলকারী ও রাজনৈতিক চক্র বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির অপচেষ্টা চালাচ্ছে, যা জবরদখলকৃত সরকারি বনভূমি উদ্ধার অভিযানকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
উচ্ছেদ অভিযানের পর বিভিন্ন মাধ্যমে ১,২০০টি ফলন্ত মালটা ও কমলা গাছ কেটে ফেলার দাবি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। তবে তদন্ত ও মাঠপর্যায়ের তথ্য যাচাইয়ে দেখা যায়, জবরদখলকৃত বনভূমিতে কর্তনকৃত গাছের প্রকৃত সংখ্যা ৬২৫টি (মোথা গণনাকৃত)। ঘটনার সত্যতা ও গাছের সংখ্যা নিয়ে ইতোমধ্যেই নানা প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনাটি গণমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনায় গত ২২ জুলাই সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় থেকে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (যুগ্মসচিব) আশরাফুর রহমানকে প্রধান করে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন সিলেট বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক আব্দুর রহমান এবং অতিরিক্ত জেলা রাজস্ব কর্মকর্তা (এডিসি রেভিনিউ) শাহিনা আক্তার। উচ্চপর্যায়ের এই তদন্ত কমিটি গত ২৩ জুলাই ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আদমপুর বন বিটের আন-সার্ভেড বনভূমির পরিমাণ ১৩ হাজার ৮০ হেক্টর। বিশাল এই বনভূমি রক্ষায় রয়েছেন মাত্র একজন বিট কর্মকর্তা, চারজন বনপ্রহরী এবং ৮৬টি ভিলেজার পরিবার। কোনো প্রকার সরকারি অনুমোদন ছাড়াই রাজকান্দি বন রেঞ্জের আওতাধীন আদমপুর, কামারছড়া ও কুরমা বন বিটের ৬ হাজার একর বনভূমিতে ভিলেজার ও প্রভাবশালী জবরদখলকারীরা পান চাষ শুরু করেছে। এর মধ্যে আদমপুর বন বিটের বড়জুড়ি, পেকির মাথা, জগাই মাথা, জগাই, ডাইনর গাং, লালছড়ি, বাঘাছড়া, ডালুয়াছড়া, রানি, আলামবাড়ি, লাউয়াছড়া ও ডাইনের সম্পদ এলাকায় প্রায় ৪ হাজার একর বনভূমিতে পানের বরজ তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া কামারছড়া বন বিটের রাঙ্গিছড়া, দিনাতের বাড়ি, ছাগলডেমা, এরাব টিলা ও জ্বালানি টিলা এলাকায় ১ হাজার একরেরও বেশি বনভূমি এবং কুরমা বন বিটের কেতলাং, পেকি-১, পেকি-২, প্রকাশ ও ফিকল এলাকায় প্রায় ১ হাজার একর বনভূমিতে পান জুম গড়ে তোলা হয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, রাজকান্দি বন রেঞ্জ কর্মকর্তা প্রীতম বড়ুয়া যোগদানের পর থেকেই জবরদখলকৃত বনভূমি উদ্ধারে ধারাবাহিক অভিযান শুরু করেন। ২ ডিসেম্বর ২০২৫ কামারছড়া বিটে অভিযান চালিয়ে ৬.০০ শতক বনভূমি উদ্ধার এবং অবৈধভাবে নির্মিত একটি নতুন টিনের ঘর উচ্ছেদ,
৫ ডিসেম্বর ২০২৫ আদমপুর বিটে ১০০.০০ শতক বনভূমি থেকে পানের বরজ অপসারণ, ৫ জানুয়ারি ২০২৬ কামারছড়া বিটে ৫০.০০ শতক বনভূমি দখলমুক্ত করে অবৈধ টিনের ঘর উচ্ছেদ, ১১ মার্চ ২০২৬ আদমপুর বিটে ৫০.০০ শতক বনভূমিতে সৃজিত পানের বরজ উচ্ছেদ, ২৫ মে ২০২৬ একই বিটে ৫০.০০ শতক বনভূমি উদ্ধার, ৭ জুলাই ২০২৬: কুরমা বিটে ৩.২৯ হেক্টর (৮১২.৬৩ শতক) সংরক্ষিত বনভূমি থেকে অবৈধ পানের বরজ উচ্ছেদ এবং সর্বশেষ ১৬ জুলাই ২০২৬ আদমপুর বিটে পরিচালিত বৃহৎ যৌথ অভিযানে ৫.০০ একর (৫০০ শতক) সংরক্ষিত বনভূমি উদ্ধার করা হয়। এ সময় অবৈধভাবে গড়ে তোলা মালটা, কমলা ও আনারসের বাগান, মাছের ঘেরসহ বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়।
বন বিভাগের সূত্রে আরও জানা যায়, ঠিলাগাঁও নসবা রোড এলাকায় ইকো রিসোর্টে জবরদখলকৃত ৬৬.৬০ একর ও কালিছালি এলাকায় ২৩.৪৭ একর ভূমি উদ্ধারের চেষ্টা করলে জবরদখলকারী প্রভাবশালী চক্রের বাঁধাপ্রাপ্ত ও রোষানলে পড়েন কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে, ২৪ জুন ২০২৬ তারিখে দলই চা বাগান সংলগ্ন এলাকায় চা বাগানের গাছ কর্তন ও কাঠ পাচারের অভিযোগ তদন্ত করে সহকারী বন সংরক্ষক ও রাজকান্দি রেঞ্জ কর্মকর্তা ক্ষয়ক্ষতির বিপরীতে ৯ লাখ ৪ হাজার ৩৭৬ টাকা সরকারি রাজস্ব আদায় করেন।
এদিকে মালটা বাগান উচ্ছেদের পর সরেজমিন অনুসন্ধান এবং বন বিভাগের তথ্য পর্যালোচনায় বেশ কিছু অসংগতি সামনে এসেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মহেব উল্লার শ্বশুর হতে বন ভিলেজার হিসেবে মহিব উল্ল্যা সংরক্ষিত সমতল বনভূমিতে চাষাবাদ করার জন্য আড়াই একর ভূমি অলিখিতভাবে ভোগদখল করার সুযোগ পান। (যা বন ভিলেজার হিসেবে খাসিয়া ৫২ ও বাঙালি ৩৪ সহ মোট ৮৬টি পরিবারের সকলেই ভোগদখল করছেন)। তবে মহিব উল্ল্যার পুত্র আলীম উল্ল্যা কর্মসূত্রে ঢাকায় অবস্থান করলেও মাঝে মধ্যে বাড়ি এসে পিতার নামে থাকা অলিখিত ভূমির বাইরে কোনো অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৮ বছর পূর্বে কৌশলে আরও প্রায় ৫ একর ভূমি দখলে নেন। সেখানে তিনি মালটা, কমলা, নাগা মরিচ ও কলার আবাদ করেন এবং পাশে টিলা কেটে পুকুর তৈরি করে মাছ চাষ শুরু করেন।
সম্প্রতি আলীম উল্ল্যা ও তার পিতা বাড়ির ভেতরে মাটি কেটে আরও একটি গর্ত খনন কাজ শুরু করলে আদমপুর বন বিটের টহল দল তা দেখতে পায়। বিট কর্মকর্তা অর্জুন কান্তি দস্তিদারকে নিয়ে গর্ত খননে বাধা দিলে তারা বনকর্মী শাহিনুর আলমকে আহত করে এবং বনকর্মী শাহ আলমের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। এই ঘটনায় বিট কর্মকর্তা বন আইনে মামলা দায়ের করেন। এর পরপরই বন বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ অভিযানে মালটা বাগান ও ফিসারিতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
উচ্ছেদ ঘটনার পরই স্থানীয় ভূমি জবরদখলকারী ও প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় আলীম উল্ল্যা ও তার পরিবার বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ তোলেন। তবে পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যের মধ্যে গাছের সংখ্যা, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও কথিত চাঁদার অঙ্কে চরম অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে।
আলীম উল্ল্যা ও তার পরিবারের অভিযোগ, চাঁদা না দেওয়ায় বন বিভাগ গাছ কেটে ফেলেছে। তবে চাঁদার পরিমাণ নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। আলীম উল্ল্যার স্ত্রী সালমা বেগম দাবি করেন, ৫০ হাজার টাকা চাঁদা চাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আলীম উল্ল্যা নিজে দাবি করেন, ৫ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল, যা না দেওয়ায় গাছ কাটা হয়। সালমা বেগম আরও বলেন, “৮ বছর ধরে টাকা দিয়ে আসছি। আগে এতো বেশি টাকা দেওয়া লাগতো না। তবে গত ৩ বছর ধরে প্রীতম বেশি জ্বালাচ্ছে আমাদের, যেকোনো সময় টাকা দাবি করে বাড়িতে লোক পাঠাচ্ছেন।
আলিম উল্লার পিতা মহেব উল্লা বলেন, প্রথমে লাল হেডম্যানের ছেলের মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকা, তারপর ভাগিনা সালামের মাধ্যমে ১৫ হাজার টাকা এবং পরে আরও ২০ হাজার টাকা এভাবে ৩ বারে মোট ৮৫ হাজার টাকা আদমপুর বিট কর্মকর্তা অর্জুন কান্তি দস্তিদারের কাছে ৩ বছর ধরে দিয়ে আসছেন।
অথচ দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, রেঞ্জ কর্মকর্তা প্রীতম বড়ুয়া এবং বিট কর্মকর্তা অর্জুন কান্তি দস্তিদার তাদের কর্মস্থলে যোগদান করেছেন যথাক্রমে মাত্র ৭ মাস এবং ১৭ মাস।
চাঁদা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মহেব উল্লা বলেন, প্রীতম বড়ুয়া আমাদের এখানে এসেছেন মাত্র দুই দিন আর আমরাও উনাকে কোনো দিনই কোন টাকা-পয়সা দেইনি।
অন্যদিকে টাকা লেনদেনের বিষয়ে মহেব উল্লার ভাগিনা আব্দুস সালাম বলেন, আমি কাউকে টাকা দেইনি, আর এই টাকা লেনদেনের বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। বন বিভাগের লোকের গায়ে হাত তোলার কারণেই সমস্যা বেঁধেছে, তাছাড়া আমরা শান্তিপূর্ণভাবেই বসবাস করে আসছিলাম।
বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সংরক্ষিত বনভূমি দখলমুক্ত করা, অবৈধ স্থাপনা ও বাণিজ্যিক চাষাবাদ অপসারণ এবং বনজ সম্পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যেই এসব অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বনভূমি ধ্বংস, গাছ কাটা ও বনজ সম্পদ পাচারের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে। ভবিষ্যতেও সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষায় এ ধরনের অভিযান নিয়মিত পরিচালনা করা হবে।
পরিদর্শনকালে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আশরাফুর রহমান (যুগ্মসচিব) স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, “আমরা ঘটনাস্থলের তথ্য-উপাত্ত, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ভুক্তভোগী ও বন বিভাগের বক্তব্য সংগ্রহ করেছি। এগুলো পর্যালোচনাক্রমে কিছুদিনের মধ্যে সরকারের নিকট দাখিল করবো।”
সিলেট বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক আব্দুর রহমান বলেন, আমি তদন্ত কাজে সহযোগিতার জন্য এসেছি। তদন্তকাজ চলমান রয়েছে। এই মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি কিছু বলা যাবে না।
এদিকে এলাকার সচেতন মহল মনে করেন, বনভূমি রক্ষা করা শুধু বন বিভাগের একার দায়িত্ব নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়। কিন্তু আইনানুগ দায়িত্ব পালনের সময় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অতিরঞ্জিত তথ্য প্রচার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এতে মূলত দায়িত্ব পালনকারীদের বাধা সৃষ্টি ও নিরুৎসাহিত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।