সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ব্যবহার করে ফটোকার্ড ছড়ানোর অভিযোগ, তদন্ত ও প্রতিকারের দাবি

চট্টগ্রামে সরকারি কর্মকর্তাদের নাম, ছবি ও পদবি ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর তথ্য প্রচার, হয়রানি এবং এর মাধ্যমে অর্থ আদায়ের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা ও দপ্তরকে টার্গেট করে ফটোকার্ড তৈরি করে ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দিচ্ছে। পরে এসব পোস্টের লিংক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, সরকারি দপ্তর ও বিভিন্ন মহলে পাঠিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপবাদমূলক বক্তব্য প্রচার করা হয়। এরপর পোস্ট সরিয়ে ফেলা, সংশ্লিষ্ট কনটেন্ট আর না ছড়ানো কিংবা ভাইরাল হওয়া ঠেকানোর কথা বলে অর্থ দাবি করা হয়। একটি গ্রুপ বা পেজ থেকে অন্য গ্রুপ ও ব্যক্তিগত আইডিতে লিংক ছড়িয়ে দিয়ে পরিকল্পিতভাবে এসব কনটেন্টের বিস্তার ঘটানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কয়েকজনের ভাষ্য, এ ধরনের ঘটনায় তারা সামাজিক ও পেশাগতভাবে বিব্রত হওয়ার পাশাপাশি অযাচিত মানসিক চাপের মুখে পড়ছেন। সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাভাবিক কর্মপরিবেশও এতে বিঘ্নিত হচ্ছে।

তবে কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি বা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রমাণসহ উপস্থাপন এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তদন্ত হওয়া উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে কারও ব্যক্তিগত বা পেশাগত সুনাম ক্ষুণ্ন করা হলে সেটিও আইনগতভাবে তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভ্রান্তি

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি দপ্তরের ক্রয়, উন্নয়নকাজ কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সাধারণত একক কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে সম্পন্ন হয় না। এসব ক্ষেত্রে নির্ধারিত আইন ও বিধি, ক্ষমতা অর্পণ, সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশ এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের মতো একাধিক ধাপ থাকে। ফলে কোনো একটি সিদ্ধান্ত বা কার্যক্রমের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে একজন কর্মকর্তাকে এককভাবে দায়ী করে উপস্থাপন করলে প্রকৃত তথ্য আড়াল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সম্প্রতি পাহাড়তলী রেলওয়ে এলাকার একটি সরকারি অফিসকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ফটোকার্ড নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ফটোকার্ডে যে কর্মকর্তার নাম ও ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, তিনি ওই অফিসের প্রধান নন। প্রচলিত সরকারি বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কাজ অনুমোদন বা সম্পাদনের একক ক্ষমতাও তাঁর নেই।

অভিযোগকারীদের মতে, ফটোকার্ডের ভাষা ও উপস্থাপনার কারণে এমন একটি ধারণা তৈরি হতে পারে যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এককভাবে পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন। এতে প্রকৃত প্রশাসনিক কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি ওই কর্মকর্তার সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য প্রচার, সাইবার হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, মানহানি কিংবা অর্থ দাবির মতো অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে।

তাঁদের মতে, একই সঙ্গে কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগও যেন আড়াল না হয়। অভিযোগের ধরন ও গুরুত্ব অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা বা অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা জনসমক্ষে আনা প্রয়োজন। এতে একদিকে নির্দোষ কেউ হয়রানির শিকার হওয়া থেকে রক্ষা পাবেন, অন্যদিকে প্রকৃত অনিয়ম থাকলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

যাচাই ছাড়া তথ্য ছড়ানো নিয়ে উদ্বেগ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো পোস্ট, ফটোকার্ড কিংবা ভিডিও প্রকাশিত হলেই সেটিকে সত্য ধরে নিয়ে শেয়ার বা প্রচার না করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে কোনো অভিযোগের পক্ষে নথি, সরকারি সিদ্ধান্ত, তদন্ত প্রতিবেদন বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।

তাঁদের মতে, একটি অসত্য বা বিভ্রান্তিকর পোস্ট অল্প সময়ের মধ্যে অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে পোস্টটি সরিয়ে ফেললেও এর স্ক্রিনশট, কপি বা লিংক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে থেকে যাওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সামাজিক ও পেশাগত ক্ষতি সহজে পূরণ হয় না।

কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন

সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, অনলাইনে সরকারি কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে মিথ্যা তথ্য, মানহানিকর বক্তব্য, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা অর্থ দাবির অভিযোগ থাকলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকৃত সাংবাদিকতা, তথ্য প্রকাশের অধিকার এবং সমালোচনার সুযোগ অক্ষুণ্ন রেখেই আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে দায়ীদের শনাক্ত করা গেলে এ ধরনের হয়রানি বন্ধে কার্যকর নজির তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা প্রমাণ ও নথির ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপনের সংস্কৃতি জোরদার করা জরুরি।

কারণ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার বা অনলাইন হয়রানি শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সুনামকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এর প্রভাব সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের স্বাভাবিক পরিবেশের ওপরও পড়তে পারে। তাই অভিযোগের সত্যতা যাচাই, তথ্যের উৎস অনুসন্ধান, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ—এই চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে।