বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম জোরদার করেছেন প্রকৌশলী মো. মামুনুল ইসলাম। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে টিকিট কালোবাজারির অভিযোগে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) দুই সদস্য আটক হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাকে জড়িয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও, ওই প্রতিবেদনে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগের পক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
বরং বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকাশিত কর্মকর্তাদের তালিকায় মামুনুল ইসলাম, পিইঞ্জকে বর্তমানে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ৩ সেপ্টেম্বরের আদেশে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) পদ থেকে মামুনুল ইসলামকে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে পদায়ন করা হয়। একই আদেশে পূর্বাঞ্চলের তৎকালীন জিএম মো. সুবক্তগীণকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) পদে পদায়ন করা হয়।
দায়িত্ব গ্রহণের পরই মাঠপর্যায়ে তৎপরতা
নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর মামুনুল ইসলামের কর্মকাণ্ডের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে মাঠপর্যায়ে সরেজমিনে পরিদর্শন। ১২ সেপ্টেম্বর তিনি পূর্বাঞ্চল রেলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পরিদর্শন করেন। এর মধ্যে ছিল রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমি, চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ড, টার্ন টেবল, ট্রায়াঙ্গেল লাইন, ইয়ার্ড লাইন, লোকোশেড, কন্টেইনার কোম্পানির কার্যক্রম এবং পদ্মা অয়েল সাইডিং লাইন। পরিদর্শনকালে তিনি ইঞ্জিনের রক্ষণাবেক্ষণ, ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, পণ্য পরিবহন ও অবকাঠামোর বিভিন্ন বিষয় সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন । রেলওয়ের মতো বিশাল ও বহুমাত্রিক প্রতিষ্ঠানে একজন নতুন মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্ব গ্রহণের পর মাঠপর্যায়ে এ ধরনের তৎপরতা প্রশাসনিক কার্যক্রমকে গতিশীল করার একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই দেখা যায়।
সিলেটের ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্যও রয়েছে
সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে টিকিট কালোবাজারির অভিযোগে আরএনবির দুই সদস্য আটকের ঘটনা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখার মতো। ৮ সেপ্টেম্বর রাতে জেলা প্রশাসনের অভিযানে তাদের আটক করা হয় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অভিযানের সময় রেলের টিকিট ও টিকিট সংগ্রহে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন জব্দের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। অর্থাৎ, ঘটনাটি গোপন করার পরিবর্তে আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই এসেছে—এমন তথ্যই প্রকাশিত সংবাদগুলোতে পাওয়া যায়।
কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা কিংবা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে প্রশাসনিকভাবে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। একইভাবে কোনো কর্মচারীকে পুনর্বহাল বা দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আদেশ, বিধিবিধান ও প্রশাসনিক কারণ বিবেচনা করা হয়ে থাকে। তাই কোনো কর্মচারীকে ‘মানবিক কারণে’ পুনর্বহাল করা হয়েছে—এমন অভিযোগ থাকলেও সেটিকে সরাসরি অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করার আগে সংশ্লিষ্ট আদেশ, নথি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যাচাই করা জরুরি।
অভিযোগের সঙ্গে প্রমাণের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ
সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে পূর্বাঞ্চলের জিএমের বিরুদ্ধে ‘মানবিক কারণে’ একজনকে পুনর্বহালের অভিযোগ তোলা হয়েছে। পাশাপাশি আরএনবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের উল্লেখযোগ্য অংশই অভিযোগকারীর বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন কোনো আদালতের রায়, তদন্ত প্রতিবেদন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
বিশেষ করে কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান বা তদন্ত চলমান থাকার দাবি থাকলে সেটিও তদন্তের সমাপ্তি বা অপরাধ প্রমাণের সমার্থক নয়। তদন্তের ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে কাউকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
নতুন জিএমের সামনে বড় দায়িত্ব
বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেল প্রশাসনিক অঞ্চল। যাত্রী পরিবহন, পণ্য পরিবহন, ট্রেন পরিচালনা, স্টেশন ব্যবস্থাপনা, রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন প্রকল্প—সব মিলিয়ে এ অঞ্চলের দায়িত্ব অত্যন্ত বিস্তৃত।
উন্নয়ন বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা নিয়ে মামুনুল ইসলামের পূর্বাঞ্চলের জিএম হিসেবে পদায়নও প্রশাসনিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে তার নতুন দায়িত্বকে পূর্বাঞ্চলের পরিচালন, অবকাঠামো ও মাঠ প্রশাসনকে আরও গতিশীল করার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই একাধিক স্থাপনা পরিদর্শনের মাধ্যমে তিনি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করছেন—এমন একটি চিত্রও সামনে এসেছে।
যাচাই ছাড়া ব্যক্তিকে বিতর্কিত করা কতটা যুক্তিসঙ্গত?
একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশের ক্ষেত্রে অভিযোগ, প্রমাণ, প্রশাসনিক নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য—সবগুলো দিক বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নতুন দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার সঙ্গে তাকে ব্যক্তিগতভাবে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা প্রয়োজন।
সিলেটে টিকিট কালোবাজারির অভিযোগে আরএনবির সদস্য আটকের ঘটনাটি তদন্ত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়াই প্রত্যাশিত। একই সঙ্গে যদি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও রয়েছে।
তবে প্রমাণিত তথ্যের বাইরে অনুমান, অজ্ঞাতনামা অভিযোগ কিংবা যাচাই না হওয়া বক্তব্যের ভিত্তিতে পূর্বাঞ্চলের নতুন জিএমকে বিতর্কিত করার প্রবণতা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের প্রকৃত চিত্রকে আড়াল করতে পারে।
মামুনুল ইসলামের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—পূর্বাঞ্চলের রেলসেবা আরও কার্যকর করা, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা জোরদার করা, অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং যাত্রীসেবার মান উন্নত করা। দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতায় তার কার্যক্রমের প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়াই হবে অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।