ঠাকুরগাঁওয়ে ২০১১ সালে সংঘটিত এক শিশু ধর্ষণ মামলার দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। ঘটনার প্রায় ১৫ বছর পর দেয়া এ রায়ে তিনজনকে প্রাকৃতিক মৃত্যু পর্যন্ত আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং অপর তিনজনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ছয় আসামির প্রত্যেককে অর্থদণ্ড করা হয়েছে। আদালত আদেশে বলেছেন, আদায় করা অর্থ ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদান করতে হবে।
রোববার (১৯ জুলাই) ঠাকুরগাঁওয়ের শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) আলী মনসুর বহুল প্রতীক্ষিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালের ২১ অক্টোবর বিকালে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী তার এক বান্ধবীর বাড়িতে বেড়াতে যান। সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফেরার সময় ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় সড়কের পাশে একটি পেট্রোল পাম্প সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে কয়েকজন যুবক তার গতিরোধ করে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, প্রথমে দুই যুবক কিশোরীর মুখ চেপে ধরে তাকে জোর করে পেট্রোল পাম্পের পেছনের একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। পরে মোবাইল ফোনে আরও কয়েকজনকে ডেকে আনা হয়। সেখানে তিনজন পালাক্রমে কিশোরীকে ধর্ষণ করে এবং অন্য তিনজন এ অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা করে।
এক পর্যায়ে কিশোরীর চিৎকার শুনে পাশ দিয়ে যাওয়া এক ব্যক্তি ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে এলে আসামিরা পালিয়ে যায়। পরে ওই ব্যক্তি ভুক্তভোগীকে কাপড়ের ব্যবস্থা করে তার পরিচিতদের কাছে পৌঁছে দেন। পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি জানতে পেরে তাকে চিকিৎসার জন্য ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন।
ঘটনার তিন দিন পর, ২০১১ সালের ২৫ অক্টোবর ভুক্তভোগীর বাবা ঠাকুরগাঁও সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করলে মামলার বিচার শুরু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষ্যগ্রহণ, আলামত উপস্থাপন এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত এ রায় দেন।
রায়ে আদালত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) এর ৯ (৩) ধারায় আসামি মো. আনিছ ওরফে রানা, মো. সাইফুল ইসলাম ও মো. দুলালকে দোষী সাব্যস্ত করে প্রাকৃতিক মৃত্যু পর্যন্ত আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে তাদের প্রত্যেককে ২ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে।
এছাড়া অন্য তিন আসামি মো. আনিছুর, মো. খতিবুর ওরফে খতু এবং মো. লালুকে একই আইনের ৯(৩)/৩০ ধারায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেনয়া হয়েছে। তদের প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার সুবিধা পাবেন না। অর্থাৎ বিচারাধীন অবস্থায় হাজতে কাটানো সময় তাদের দণ্ডের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে না। পাশাপাশি তারা জেল কোড অনুযায়ী কোনো ধরনের সাজা মওকুফ বা রেমিশনের সুবিধাও পাবেন না।
অন্যদিকে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি আইন অনুযায়ী বিচারাধীন অবস্থায় কারাভোগের সময় ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার সুবিধা পাবেন।
আদালত আরও নির্দেশ দেন, দণ্ডিতদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য হবে। যদি দণ্ডিতরা অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হন, তাহলে তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে সেই অর্থ আদায় করতে হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
রায় কার্যকরের অংশ হিসেবে আদালত পাঁচ দণ্ডিত আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তবে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মো. আনিছ ওরফে রানা পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। আদালত উল্লেখ করেন, তিনি গ্রেপ্তার বা আত্মসমর্পণের পর থেকে তার সাজা কার্যকর হবে।
২০১১ সালে সংঘটিত এ ঘটনাটি সে সময় ঠাকুরগাঁও জেলায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ঘোষিত এ রায়ে মামলার ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পন্ন হলো।
এ বিষয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুস সুবাহান বলেন, ‘আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট নই। আমার মক্কেল এই মামলায় ন্যায়বিচার পাননি বলে আমরা মনে করি। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সংগ্রহের পর উচ্চ আদালতে এর বিরুদ্ধে আপিল করা হবে।’
রায় ঘোষণার পর সরকার পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ বদরুল চৌধুরী বলেন, ‘আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে এ রায় দিয়েছেন। দীর্ঘদিন পর হলেও ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পেয়েছেন। এ রায় নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে।’