পাহাড়ে উঠে নেটওয়ার্ক খুঁজে নিট প্রস্তুতি, দুই বোনের সাফল্য

ঘরে মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, তবু থামেনি চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন

বাড়িতে মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। অনলাইনে পড়াশোনা করতে হলে উঠতে হয় পাহাড়ে। কখনও জঙ্গলঘেরা এলাকায়, আবার কখনও পাহাড়ের উঁচু জায়গায় গিয়ে মোবাইলে সিগন্যাল খুঁজে নিতে হয়। এমন প্রতিকূলতার মধ্যেই ভারতের ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত মহুলপঙ্খা গ্রামের দুই বোন যজ্ঞসেনী খাতুয়া ও দিব্যসেনী খাতুয়া প্রস্তুতি নিয়েছেন নিট ২০২৬ পরীক্ষার জন্য। শেষ পর্যন্ত তাঁদের সেই পরিশ্রম পেয়েছে সাফল্যের স্বীকৃতি।

পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যও ছিল সীমিত। ব্যয়বহুল কোচিং বা প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ হয়নি তাঁদের। কৃষক বাবা গৌরাঙ্গ খাতুয়া এবং অঙ্গনওয়াড়ি সহায়িকা মা সুনীতা খাতুয়ার সীমিত আয়ের মধ্যেই দুই মেয়ের পড়াশোনা চলেছে।

মহুলপঙ্খা গ্রামটি ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার কাপ্তিপদা ব্লকের মাজিগড়িয়া পঞ্চায়েতের অন্তর্গত। প্রত্যন্ত এই গ্রামে বাড়ির ভেতরে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অথচ চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন দুই বোন। ফলে অনলাইন পড়াশোনার জন্য তাঁদের বেছে নিতে হয়েছে ভিন্ন পথ।

যেখানে মোবাইলে তুলনামূলক ভালো সিগন্যাল পাওয়া যায়, সেখানেই বই-খাতা ও মোবাইল নিয়ে বসে পড়তেন তাঁরা। কখনও পাহাড়ের চূড়ায়, কখনও জঙ্গলঘেরা এলাকায় চলত অনলাইন ক্লাস। প্রয়োজন হলে দীর্ঘ সময় সেখানেই পড়াশোনা করতে হতো।

শহরের শিক্ষার্থীরা যে অনলাইন ক্লাস ঘরে বসেই করতে পারেন, সেই একই সুযোগ পেতে দুই বোনকে প্রতিদিন বাড়তি সংগ্রাম করতে হয়েছে। নেটওয়ার্কের সংকট তাঁদের পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালেও লক্ষ্য থেকে সরাতে পারেনি।

ব্যয়বহুল নিট প্রশিক্ষণের সুযোগ না থাকায় অনলাইন ক্লাস, আত্মপাঠ এবং নিজেদের সংগ্রহ করা পড়ার উপকরণই ছিল তাঁদের প্রধান ভরসা। পাশাপাশি দুই বোন একে অপরের পড়াশোনায় সহযোগিতা করেছেন। কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে আলোচনা করেছেন, প্রস্তুতির দুর্বলতা কাটাতে একে অপরকে সাহায্য করেছেন।

এই যাত্রায় বড় বোন যজ্ঞসেনীর অভিজ্ঞতাও ছোট বোন দিব্যসেনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যজ্ঞসেনী তৃতীয় প্রচেষ্টায় নিট ২০২৬-এ সফল হয়েছেন। অন্যদিকে দিব্যসেনী প্রথমবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েই উত্তীর্ণ হয়েছেন।

দুই বোনের এই সাফল্যের পেছনে পরিবারের সমর্থনও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সীমিত আয় সত্ত্বেও বাবা-মা তাঁদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন। দামি কোচিংয়ের সুযোগ না থাকলেও মোবাইল ফোন ও অনলাইন শিক্ষার সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি চালিয়ে গেছেন তাঁরা।

তাঁদের এই সাফল্য শুধু একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার গল্প নয়। বরং প্রত্যন্ত অঞ্চলের সীমিত পরিকাঠামো, অনলাইন শিক্ষায় অসম সুযোগ এবং আর্থিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও দৃঢ় সংকল্প থাকলে কীভাবে নিজের জন্য পথ তৈরি করা যায়—তারই উদাহরণ যজ্ঞসেনী ও দিব্যসেনী।

এখন দুই বোনের লক্ষ্য চিকিৎসক হওয়া। নিটে সাফল্যের পর তাঁদের স্বপ্ন আরও এক ধাপ এগিয়েছে। ভবিষ্যতে চিকিৎসক হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান তাঁরা।

পাহাড়ে উঠে মোবাইলের সিগন্যাল খোঁজা থেকে শুরু করে দীর্ঘ সময় আত্মপাঠ—দুই বোনের এই সংগ্রামের গল্প তাই শুধু সাফল্যের নয়, স্বপ্নের পেছনে অবিচল থাকারও এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প।