বন্দরের রেকর্ডে শ্রমিকের ঘাম ৬ হাজার ৭৫০ কর্মীর হাতে ১৬ কোটি টাকার প্রণোদনা

ভোরের আলো ফোটার আগেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি। একের পর এক জাহাজ ভেড়ে, বিশাল ক্রেনের ওঠানামায় কনটেইনার সরতে থাকে। কারও হাতে যন্ত্রপাতি, কেউ ব্যস্ত পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজে, কেউ আবার জাহাজ ও টার্মিনালের কার্যক্রম সচল রাখতে ছুটছেন এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত—এই শ্রমের ওপর ভর করেই সচল দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার।

সেই শ্রমের স্বীকৃতিও মিলেছে। রেকর্ড পরিমাণ কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের সাফল্যের পর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তালিকাভুক্ত ৬ হাজার ৭৫০ জন শ্রমিক ও কর্মচারীকে বিশেষ উৎসাহ বোনাস হিসেবে ১৬ কোটি ৬৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি বন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্টদের হাতে বোনাসের চেক তুলে দেওয়া হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগে শ্রমিক-কর্মচারীদের অবদানের স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি রেকর্ড হ্যান্ডলিংয়ের পেছনে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ভূমিকা সামনে এসেছে।

রেকর্ডের পেছনে যারা

চট্টগ্রাম বন্দর শুধু একটি বন্দর নয়; বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ২০২৫ সালে বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৬৯ টিইইউএস—যা বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। একই সময়ে কার্গো ও জাহাজ হ্যান্ডলিংয়েও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সামনে থাকা দৃশ্যমান অংশটি কনটেইনার, ক্রেন আর জাহাজ। কিন্তু এর আড়ালে রয়েছে হাজারো শ্রমিক-কর্মচারীর নিরলস পরিশ্রম। একটি জাহাজ বন্দরে আসা থেকে পণ্য ওঠানো-নামানো, কনটেইনার স্থানান্তর এবং জাহাজ ছাড়ার প্রস্তুতি—প্রতিটি ধাপেই তাদের সরাসরি অংশগ্রহণ রয়েছে।

এক বছরে বদলে গেল হিসাব

২০২৫ সালের রেকর্ডের ধারাবাহিকতা পরের অর্থবছরেও দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর ৩৫ লাখ ৩১ হাজার ১১৩ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। একই সময়ে কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন, আর জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে ৪ হাজার ৩৩৬টি।

অর্থাৎ বন্দরের সক্ষমতা শুধু একটি সূচকে নয়—কনটেইনার, কার্গো ও জাহাজ—তিন ক্ষেত্রেই বেড়েছে।

অর্থনীতির স্পন্দন যেখানে

দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বড় একটি অংশ চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বন্দরের কার্যক্রমে গতি মানে শুধু জাহাজ দ্রুত খালাস হওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিল্পকারখানার কাঁচামাল, তৈরি পোশাকের রপ্তানি পণ্য, ভোগ্যপণ্যসহ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

একটি কনটেইনার দ্রুত খালাস হওয়ার পেছনে যেমন আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার ভূমিকা রয়েছে, তেমনি রয়েছে শ্রমিকের দক্ষতা ও পরিশ্রম।

প্রণোদনা শুধু টাকা নয়, স্বীকৃতিও

১৬ কোটি ৬৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার এই বোনাস তাই শুধু একটি আর্থিক প্রণোদনা নয়—বন্দর পরিচালনায় শ্রমিক-কর্মচারীদের অবদানের একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও।

বন্দরের রেকর্ডের পরিসংখ্যান যখন কাগজে লেখা হয়, সেখানে সংখ্যাগুলোই চোখে পড়ে—কত TEU কনটেইনার, কত টন কার্গো, কতটি জাহাজ। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে মানুষের শ্রম।

সেই মানুষগুলোর হাতেই যখন রেকর্ডের পুরস্কার পৌঁছে যায়, তখন বন্দরের সাফল্যের গল্পটি আর শুধু জাহাজ-কনটেইনারের গল্প থাকে না; হয়ে ওঠে শ্রম, দক্ষতা আর দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া হাজারো মানুষের গল্প।

চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে তাই প্রতিদিন যে কর্মব্যস্ততা দেখা যায়, তার প্রতিটি শব্দের সঙ্গে মিশে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতির স্পন্দন—আর সেই স্পন্দন সচল রাখার অন্যতম শক্তি এই শ্রমিক-কর্মচারীরাই।