চারদশকে নিশ্চিহ্ন ২৪ হাজার

বিপন্ন জলাধার বিপন্ন চট্টগ্রাম

বর্তমান বাস্তবতায় ভাবলেই আশ্চর্য হতে হয় যে মাত্র ১৬ বছর আগে (১৯৯১ সালে) চট্টগ্রামে প্রায় বিশ হাজার (১৯, ২৫০টি) পুকুর জলাশয় ছিল সেগুলোর মধ্য থেকে গত বিশ বছর আগে (২০০৬-৭ সালের জরিপ অনুসারে) নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ১৪ হাজারেরও বেশি। বাদ বাকি প্রায় সাড়ে ৪ হাজার (৪,৫২৩ টি) পুকুর দিঘি খাল ও অন্যান্য জলাশয়ের মধ্য থেকে ২০২৩ সালে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ২৪৫৯ টি। ওইসময়ের বিএস জরিপ অনুসারে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে কোন মতে টিকে থাকা পুকুর জলাশয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায় তার অর্ধেক। অবশিষ্ট জলাশয়গুলো খুব দ্রæত নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে বর্তমানে শুধুমাত্র ঐতিহ্যবাহী লালদীঘি ছাড়া আশকার দিঘি, রাণীর দিঘি, এনায়েতবাজার গোয়ালপাড়ার প্রাচীণ পুকুর, রথের পুকুর, জোর ডেবার দিঘিসহ আরো অসংখ্য দিঘি পুকুর জলাশয় এখন নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। চট্টগ্রামের মতো একটি পাহাড়ি অঞ্চলে এতো বিপুল পরিমাণ পুকুর দিঘি রয়েছে যে যেসবের নামে এখনও সংলগ্ন অনেক এলাকাই শুধু অতীত ঐতিহ্যেও স্বাক্ষ্য দিয়ে যাচ্ছে কিন্তু পুকুরের অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না। বিভিন্ন সময়ের গবেষণা ও প্রতিবেদনে বিশ্লেষণে দেখা গেছে গত ৪০ বছরে প্রায় ২৪,০০০ পুকুর ও জলাশয় বিলুপ্ত হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
২০০১-২০২১ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি এলাকায় মোট ভূপৃষ্ঠজল (সারফেস ওয়াটার) প্রায় ২০.৫১ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে ৩৭ শতাংশ জলাশয় মাটিতে চাপা পড়ে নগর অবকাঠামোয় রূপান্তরিত হয়েছে। সা¤প্রতিক সিডিএ জরিপ অনুযায়ী, শহরে বর্তমানে মাত্র ২ হাজার ৯২টি জলাশয় অবশিষ্ট রয়েছে। যেখানে ১৯৭৮ থেকে ৮৪ সালের সরকারি জরিপে ছিল ৪ হাজার ৩৩২টি। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেকেরও বেশি জলাশয় হারিয়ে গেছে। এর ফলে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে। ভ‚গর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে। এরফলে গভীর নলক‚পের ওপর নগরবাসীর নির্ভরতা বাড়ছে। কিন্তু ভূ প্রাকৃতিক গঠনশৈলী সুরক্ষার স্বার্থে গভীর নলকূপের অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছেনা। পুকুর জলাশয় না থাকায় শহরের তাপমাত্রা বেড়ে গেছে (আরবান হিট আইল্যাÐ ইফেক্ট)। এছাড়া দেশীয় মাছ, জলজ উদ্ভিদসহ জীববৈচিত্রের আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ার জন্যও জলাশয় ভরাট একমাত্র দায়ী। সেইসাথে ঐতিহাসিক পুকুর ও দিঘিগুলোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিলুপ্তির ঝুঁকি তো রয়েছেই।
পরিবেশ আন্দোলন সংগঠক শরীফ চৌহান বলেছেন, চট্টগ্রামের পুকুর ও জলাশয় রক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। যা এখনো হয়নি। এছাড়া জলাধার অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ, প্রাকৃতিক জলাধার পুনরুদ্ধার এবং নগর পরিকল্পনায় জলাশয় সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় জলাবদ্ধতা, পানিসংকট ও পরিবেশগত ক্ষতি ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।’
এব্যাপারে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, সিডিএ’র মাস্টারপ্ল্যানেই এই বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে রয়েছে। এটা সত্যিই দু:খজনক যে বর্তমানে চট্টগ্রামে পুকুর জলাশয় জলাধার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ক্রমবর্ধমান জনবসতির চাপে নতুন করে জলাধার সৃষ্টি করা সম্ভবও নয়। তাই আমরা বলেছি, নতুন করে যারা ভবন নির্মাণ করবেন তারা যেন কোন ভাবেই আর খাল, পুকুর জলাশয় এসব ভরাট করতে না পারে। সিডিএ চেয়ারম্যান আরো বলেন, আজকে যে নগর জুড়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে তা এই অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণেই হচ্ছে। আমরা এব্যাপারে কঠোর থেকে কঠোরতর হবো। সিডিএ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন আরো বলেন, ক্রমবর্দ্ধমান জনবসতির চাপের বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা হংকং এর মতো উন্নত দেশগুলোর আদলে এখন হাইরাইজ বিল্ডিং এর অনুমোদনের দিকে যাচ্ছি। জনবসতির ক্রমবর্ধমান চাপ তো অস্বীকার করা যাবে না। তাই আমরা ১৫- ২০ তলা ভবনের অনুমোদনে আগ্রহী হচ্ছি। সিডিএ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন আরো বলেন, চট্টগ্রামকে বাসযোগ্য এবং যুগোপযোগী নগরে পরিণত করতে জাতীয় পর্যায়েও ভাবনা চিন্তা রয়েছে। সরকার এবিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক ।