নখেই মিলতে পারে শরীরের নানা রোগের ইঙ্গিত! কোন পরিবর্তন কী সংকেত দেয় জানুন

নখের রং, আকৃতি, গঠন ও শক্তিতে হঠাৎ পরিবর্তন কখনো কখনো রক্তস্বল্পতা, হৃদ্‌যন্ত্র, লিভার, কিডনি, থাইরয়েড কিংবা শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে

সবসময় আমাদের শরীর একইভাবে সুস্থ থাকে না। নানা কারণে শরীরে বিভিন্ন রোগ বাসা বাঁধতে পারে। আর কোনো রোগ হলে তার প্রভাব অনেক সময় শরীরের বাইরেও প্রকাশ পায়। ত্বকে র‍্যাশ, চুল পড়া কিংবা চুলের রং বদলে যাওয়ার মতো পরিবর্তনকে আমরা অনেক সময় স্বাভাবিক বলে এড়িয়ে যাই। কিন্তু শরীরের আরও কিছু অঙ্গও ভেতরের অসুস্থতার সংকেত দিতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো নখ

বিশেষজ্ঞদের মতে, নখের রং, আকৃতি, গঠন, শক্তি এবং বৃদ্ধির ধরনে পরিবর্তন কখনো কখনো শরীরের ভেতরের কিছু সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে নখে কোনো পরিবর্তন দেখা দিলেই গুরুতর রোগ হয়েছে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। হঠাৎ বা অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

নখের আকৃতি বদলালে কী বোঝায়?

নখ মূলত কেরাটিন দিয়ে তৈরি। সুস্থ নখ সাধারণত মসৃণ, স্বাভাবিক রঙের এবং যথেষ্ট শক্ত থাকে। তবে কিছু শারীরিক সমস্যার কারণে নখের স্বাভাবিক আকৃতি পরিবর্তিত হতে পারে।

এর একটি উদাহরণ হলো ক্লাবিং। এ ক্ষেত্রে নখ অস্বাভাবিকভাবে আঙুলের ডগার দিকে বাঁকতে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে হৃদ্‌যন্ত্রের রোগ, প্রদাহজনিত অন্ত্রের সমস্যা কিংবা লিভারের সমস্যার সঙ্গে এ ধরনের নখের পরিবর্তনের সম্পর্ক থাকতে পারে।

অন্যদিকে, নখ যদি মাঝখান থেকে চামচের মতো দেবে যায় এবং তুলনামূলকভাবে সমতল হয়ে ওঠে, তাকে স্পুন নেইল বলা হয়। এ ধরনের পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রে আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

নখের রং বদলালে সতর্ক হবেন কখন?

নখের রং পরিবর্তনও শরীরের কিছু সমস্যার সংকেত দিতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, নখ হলুদ হওয়ার সাধারণ কারণের মধ্যে রয়েছে ছত্রাকের সংক্রমণ ও ধূমপান। তবে কিছু ক্ষেত্রে নখের হলুদ ভাব কিডনি বা লিভারের সমস্যার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। শ্বাসতন্ত্রের কিছু রোগ কিংবা আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রেও নখের রঙে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

তাই নখ হলুদ দেখালেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে দীর্ঘদিন ধরে এ পরিবর্তন থাকলে এর কারণ খুঁজে দেখা ভালো।

ফ্যাকাশে বা সাদা নখের কারণ কী?

নখ অস্বাভাবিকভাবে ফ্যাকাশে হয়ে গেলে তা রক্তস্বল্পতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। আবার পুরো নখ সাদা হয়ে যাওয়ার কিছু ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস বা লিভারের রোগের সম্পর্ক পাওয়া যায়।

নখে ছোট ছোট সাদা দাগ দেখা গেলেও সবসময় তা কোনো রোগের লক্ষণ নয়। অ্যালার্জি, কিছু ওষুধ কিংবা ছত্রাকের সংক্রমণের কারণে এমন হতে পারে। আবার নখে আঘাত লাগার পরও সাদা দাগ দেখা দিতে পারে, যা সময়ের সঙ্গে স্বাভাবিক হয়ে যায়।

নীল বা লালচে নখ কীসের সংকেত?

অনেক সময় নখ নীল বা লালচে রং ধারণ করতে পারে। নখের গোড়ার অর্ধচন্দ্রাকৃতির অংশে লালচে দাগ দেখা দিলে কিছু ক্ষেত্রে অটোইমিউন রোগ, আর্থ্রাইটিস বা হৃদ্‌রোগের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।

অন্যদিকে, নখের বড় অংশ নীলচে হয়ে গেলে রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতির বিষয়টি বিবেচনা করা হয়। এর পেছনে ফুসফুস বা হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা থাকতে পারে।

সবুজ বা কালচে নখ হলে কী করবেন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, নখ সবুজ বা কালচে হয়ে যাওয়ার পেছনে কখনো কখনো সংক্রমণ থাকতে পারে। আবার নখে শক্ত বাদামি বা কালো দাগ কিংবা রেখা দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বিশেষ করে দাগ বা রেখাটি যদি নতুনভাবে তৈরি হয়, আকার বা রঙে পরিবর্তন হতে থাকে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিরল ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিবর্তন মেলানোমার মতো গুরুতর সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

নখ ভেঙে যাওয়া কি রোগের সংকেত?

অনেকের নখ সহজেই ভেঙে যায়। কখনো এটি স্বাভাবিক কারণেও হতে পারে। তবে অতিরিক্ত ভঙ্গুর নখ শরীরে কিছু পুষ্টি উপাদানের ঘাটতির ইঙ্গিতও দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে বি-ভিটামিন, আয়রন, জিংক ও প্রোটিনের ঘাটতির সঙ্গে ভঙ্গুর নখের সম্পর্ক থাকতে পারে। এ ছাড়া থাইরয়েডের সমস্যাও নখের গঠন ও শক্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে হাইপারথাইরয়েডিজমের সঙ্গে ভঙ্গুর নখ দেখা যায়। আবার হাইপোথাইরয়েডিজমের ক্ষেত্রে নখ পাতলা হয়ে যেতে পারে।

নখের পরিবর্তন দেখলেই কি রোগ হয়েছে?

নখ শরীরের বিভিন্ন সমস্যার কিছু সংকেত দিতে পারে—এটি সত্য। তবে নখের কোনো পরিবর্তন মানেই গুরুতর রোগে আক্রান্ত হওয়া নয়। নখের রং, আকৃতি বা গঠনে পরিবর্তনের পেছনে আঘাত, সংক্রমণ, ওষুধ, পুষ্টির ঘাটতি কিংবা অন্যান্য সাধারণ কারণও থাকতে পারে।

তাই নখে সামান্য পরিবর্তন দেখেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে হঠাৎ, অস্বাভাবিক বা দীর্ঘস্থায়ী কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

সতর্কতা: নখের পরিবর্তন দেখে নিজে থেকে কোনো রোগের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ও উপযুক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কারণ নির্ণয় করা উচিত।