পাহাড়, বন, সমুদ্র, জলাশয় ও খাল পরিবেষ্টিত চট্টগ্রাম শহরের আদি পরিচয় বিলীন হতে চলেছে। এর অন্যতম কারণ পাহাড় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া। কেউ বলছেন, উপায় নেই। চট্টগ্রাম মানেই পাহাড়ি অঞ্চল। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে পাহাড় তো কাটতেই হচ্ছে। কিন্তু পরিবেশ সচেতন মহল বলছেন, পাহাড় হলো ভূ প্রকৃতির উর্ধমুখি স্তম্ভ। এর গঠন বিচ্যুত হলে প্রকৃতিও বিরূপ হয়। পাহাড় উজাড় হলে প্রাণ প্রকৃতির বেঁচে থাকা কঠিন হয়। মাত্র ৩ দশকে গিরিনন্দিনী চট্টগ্রামের পাহাড় উজাড় হয়েছে অর্ধেকেরও বেশি। বিভিন্ন গবেষণা পর্যালোচনায়, চট্টগ্রাম নগরের আদি পরিমাপে ৩২.৩৭ বর্গ কিলোমিটার পাহাড়ি ভূমির তথ্য পাওয়া যায়। পরবর্তী মাত্র ৩ দশকে এই পাহাড়ি ভূমির ৫৭ শতাংশ হারিয়ে টিকে আছে মাত্র ১৪.০২ বর্গকিলোমিটার। আরও সুনির্দ্দিষ্ট করে বলা যায় ১৮৫০ সালে চট্টগ্রাম নগরীতে পাহাড় ছিলো প্রায় ২৫০টির মতো। ২০২৬ সালে এসে চট্টগ্রাম নগরীতে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র প্রায় ৮০টি পাহাড়।
পাহাড় হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে তিলোত্তমা এই নগরীর নান্দনিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জলবায়ুর ভারসাম্য এবং জীববৈচিত্র্য। কয়েক দশকে চট্টগ্রামের এই ভূপ্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার জন্য অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, কতিপয় অপেশাদার আবাসন ব্যবসায়ী, শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক, অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ ও কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী দায়ী। পরিবেশবিদরা জানান, গত কয়েক দশকে প্রায় ১২০টি পাহাড় সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন অথবা ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে। পাহাড় কাটলে যে শুধু মাটি আর গাছপালা যাচ্ছে তা নয়, সেইসাথে হারিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল, বনাঞ্চল, প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ, ঝিরি, বনাঞ্চল, মূল্যবান উদ্ভিদসহ আরো অনেক কিছু। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলে বাড়ছে পাহাড় ধসের ঝুঁকি, তীব্র জলাবদ্ধতা, নগরের তাপমাত্রা এবং ভূগর্ভস্থ পানি নেমে যাওয়ার ঝুঁকি। সব ছাপিয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে পাহাড় ধসের। প্রতিবছর বর্ষা এলে অথবা অন্য যে কোন মৌসুমে ভারী বৃষ্টিপাত হলে নগরীর কোথাও না কোথাও পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। গত এক- দেড় দশকে পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম নগরীতে মৃতের সংখ্যা নিয়ে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ের তথ্যে পার্থক্য রয়েছে। উভয় পরিসংখ্যানের সমন্বিত হিসাবে যে সংখ্যা অনুমান করা যায় তাও দেড় শতাধিক। তবে শহরের আশেপাশে জেলা অঞ্চলগুলোতে পাহাড় ধসে মৃতের সংখ্যা আঁতকে ওঠার মতো।
আইন জানাচ্ছে, বাংলাদেশে অনুমতি ছাড়া পাহাড় বা টিলা কাটা দÐনীয় অপরাধ। এখানে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত), বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ও পরিবেশ আদালত আইন, ২০১০ এ পাহাড় কাটার কঠোর শাস্তির উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তেমন চিত্র নেই বললেই চলে। এসব আইনের আওতায় পরিবেশ অধিদপ্তর অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধের নির্দেশ দিতে পারে, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করতে পারে, জরিমানা আরোপ করতে পারে এবং আদালতে মামলা দায়ের করতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে কারাদÐের ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু সেখানেও রয়েছে ‘গোড়ায় গলদ।’ বিগত সময়ে কিছু মামলা হয়েছে- কিন্তু সুফল কতোটা মিলেছে ? পাহাড় কাটা কী বন্ধ হয়েছে ? পাহাড়ে অবৈধ দখল কী বন্ধ হয়েছে ? শহরের ভেতরে টিকে থাকা পাহাড়গুলো কী সবুজে ভরে উঠেছে ? সেখানে বন্যপ্রাণী ফিরে এসেছে ? এসব প্রশ্নের জবাব একটাই- না ।
পরিবেশবাদী কয়েকটি সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের দেয়া তথ্যে জানা যায়, ২০০২ সাল থেকে চট্টগ্রামে পাহাড় কাটার অভিযোগে বেশ কিছু মামলা পরিবেশ আদালতে দায়ের হয়েছে। তবে বেশিরভাগ মামলার কোন ফলাফল নেই। মামলার কাজ স্থবির হয়ে আছে নানা কারণে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য জানাচ্ছে, ২০১১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৫৬০টি অভিযান চালানো হয়েছে পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে। জরিমানা আদায় করা হয়েছে প্রায় ৮৫ কোটি ২ লাখ টাকা। তবুও অবৈধভাবে পাহাড় কাটা বন্ধ হয়নি। বরং জরিমানা দিয়ে অভিযুক্তরা দ্বিগুণ উৎসাহে পাহাড় কাটতে নেমে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি নগরের জামালখান এলাকা সংলগ্ন জয় পাহাড়ে অবৈধভাবে পাহাড় কাটার দায়ে রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান বিপিসিকে প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। এছাড়া কেটে ফেলা প্রায় সাড়ে ৯ হাজার ঘনফুট পাহাড় পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশও দেয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড় শুধুমাত্র বিপুল মাটি ও বনাঞ্চলের কোন স্থান নয়। এরসাথে জড়িয়ে থাকে একটি অঞ্চলের ইতিহাস, ভ‚প্রকৃতি, জলবায়ু এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি, কবি ও পরিবেশ সংগঠক শ.ম. বখতিয়ার মনে করছেন, ‘পাহাড় কাটা বন্ধ না হওয়ার পেছনে এই অপরাধের সাথে প্রভাবশালী ব্যক্তি, মহল ও প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা, কর্তৃপক্ষের দুর্বলতা- তদারকির অভাব, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা, কঠোর শাস্তির দৃষ্টান্তহীনতা ও বিপুল অর্থের লেনদেনই অন্যতম কারণ।
পরিবেশ সংগঠক সাংবাদিক আলীউর রহমান মনে করেন, চট্টগ্রাম টিকে থাকা পাহাড়গুলো রক্ষা করতে হলে সব ক’টা পাহাড়ের ডিজিটাল মানচিত্র ও সীমানা চূড়ান্ত করতে হবে। পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ নতুন বসতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। অবৈধ পাহাড় কাটার মামলাগুলো দ্রæত নিষ্পত্তির জন্য পরিবেশ আদালতের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাহাড় কাটায় জড়িতদের ক্ষতিপূরণের সাথে বসবাসরতদের পুনর্বাসন ও পাহাড় পুনরুদ্ধার বাধ্যতামূলক করতে হবে।
এসব জিজ্ঞাসায় চট্টগ্রাম নগরীর উন্নয়ণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা- চট্টগ্রাম উন্নয়ণ কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এর সদ্য নিযুক্ত চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেছেন কঠোর পদক্ষেপের কথা। তিনি জানান,‘ কোন অবস্থাতেই আর আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদগুলো হারাতে দেয়া যাবেনা। সিডিএ ইতোমধ্যেই পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করেছে। এই অ্যাকশন প্ল্যান কার্যকর করতে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাগণসহ সংশ্লিষ্ট সকল দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে কর্মপরিকল্পনা নির্দ্ধারণ করে কাজ শুরু করছি। সিডিএ চেয়ারম্যান বেলায়েত আরো বলেন, এই কাজে স্থানীয় জনসাধারণ, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকেও চট্টগ্রামের পাহাড় রক্ষায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে। প্রকৌশলী বেলায়েত বলেন, প্রয়োজনে আমরা চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতেও পিছপা হবো না।’