যানজট কমাতে নগর বিকেন্দ্রীকরণের প্রস্তাব পার্কিং, গণপরিবহন ও ভবনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে জোর

চট্টগ্রাম নগরের যানজট কমাতে শুধু সড়ক সম্প্রসারণ নয়, নগরের কেন্দ্রনির্ভরতা কমিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি সেবা প্রতিষ্ঠান প্রান্তিক এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। একই সঙ্গে হাইরাইজ পার্কিং নির্মাণ, আধুনিক গণপরিবহন চালু, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং ভবনের অনুমোদিত ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

যানজট, দূষণ ও অপরিকল্পিত নগরায়নের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় সভা করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। বৃহস্পতিবার চউক কার্যালয়ের সভাকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন চউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন।

সভায় চউকের সাম্প্রতিক পরিদর্শনের আওতায় আসা ২০টি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, চারটি স্কুল ও দুটি সুপারশপের প্রতিনিধির পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি সেবাদানকারী সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সভায় হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধিরা জানান, চউকের পরিদর্শনের পর পার্কিং সুবিধা বাড়ানো, ড্রপিং বে উন্নয়ন, রোগী ওঠানামার জন্য নির্ধারিত স্থান তৈরি এবং পার্কিং ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পার্কিংয়ের জন্য নতুন জায়গা কেনা বা ভাড়া নেওয়ার কথাও জানিয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা জানান, স্কুলকেন্দ্রিক যানজট কমাতে বিভিন্ন শ্রেণির পাঠদান ভিন্ন সময়ে শুরু ও শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের জন্য বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। স্কুলের সামনে যানজট নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তাকর্মী বাড়ানো ও নিজস্ব ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদারের কথাও জানানো হয়। কয়েকটি স্কুলের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পারাপারের জন্য ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের দাবিও জানানো হয়।

কেন্দ্রনির্ভরতা কমানোর প্রস্তাব

সভায় সরকারি সেবাদানকারী সংস্থার প্রতিনিধিরা বলেন, চট্টগ্রামের যানজটের স্থায়ী সমাধানে নগরের কেন্দ্রনির্ভরতা কমাতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নগরের কেন্দ্র থেকে প্রান্তিক এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি আধুনিক কিচেন মার্কেট, হাইরাইজ পার্কিং ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

অংশগ্রহণকারীরা আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল নির্মাণ না করা, ফুটপাত ও সড়ক জনসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখা এবং পর্যাপ্ত খোলা জায়গা সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেন।

সভায় বলা হয়, যানজট নিরসনে চউক, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শুধু সড়ক সম্প্রসারণ করে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ভবনের ব্যবহার, পার্কিং, গণপরিবহন, ফুটপাত, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নগর পরিকল্পনাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।

অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন ব্যবহার নয়

ভবনের অনুমোদিত ব্যবহার নিয়েও সভায় আলোচনা হয়। চউকের অনুমোদিত নকশা এবং ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদিত ফায়ার সেফটি প্ল্যান অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। যে উদ্দেশ্যে ভবনের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে, ভবনটি সেই উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করতে হবে বলে মত দেন অংশগ্রহণকারীরা।

চউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, নগরের সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। চউকের পরিদর্শনের পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা আশাব্যঞ্জক।

তিনি বলেন, “নগরকে যানজট, দূষণমুক্ত, নান্দনিক ও বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে আমি কাজ করে যাচ্ছি। আমি থামবার পাত্র নই। যতদিন আমি এই চেয়ারে আছি, এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করে যাব।”

চউক চেয়ারম্যান আরও বলেন, “একদিনে হয়তো সমস্যার সমাধান হবে না। দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধান আছে চউক কর্তৃক প্রণীত মাস্টার প্ল্যান (২০২৫–৫০) বাস্তবায়নের মাধ্যমে। এর পাশাপাশি আমরা স্বল্পমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি বিভিন্ন সমাধানের পথও দেখছি।”

তিনি বলেন, “ইতোমধ্যে যে সকল অগ্রগতি দেখেছি তা চোখে পড়ার মতো। আমরা যদি একসঙ্গে চেষ্টা করি, তাহলে অবশ্যই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।”

সভায় অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা নগরের যানজট, দূষণ ও অপরিকল্পিত নগরায়ন কমাতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কার্যকর ভূমিকা রাখার কথা জানান। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সমন্বিতভাবে নগরের সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সভায় ল্যানসেট হাসপাতাল, আল-হিদায়াহ ইন্টারন্যাশনাল, রয়েল হাসপাতাল, ন্যাশনাল হাসপাতাল, পার্কভিউ হাসপাতাল, ম্যাক্স হাসপাতাল, সিএসসিআর, ইবনে সিনা হাসপাতাল, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, চট্টগ্রাম গ্রামার স্কুল, চট্টগ্রাম আইডিয়াল স্কুল ও উৎসব সুপার মার্কেটের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।

এ ছাড়া সভায় সেবাদানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের মধ্যে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (স্টেট) এ বি ছিদ্দিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আব্দুস সালাম, চউক বোর্ড সদস্য ও পরিবেশবিদ স্থপতি জেরিনা হোসাইন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. শেখ ফজলে রাব্বি উপস্থিত ছিলেন।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পক্ষে সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল, সদস্য (ইঞ্জিনিয়ারিং ও পরিকল্পনা) মো. জামিলুর রহমান এবং সদস্য (অর্থ ও প্রশাসন) মোহাম্মদ নূরুল্লাহ নূরী।