বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তে সাশ্রয় প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নে নতুন গতি

দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথে নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষের বহুদিনের স্বপ্নের দোহাজারী–রামু–কক্সবাজার রেলপথ এখন দেশের অন্যতম সফল অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। দীর্ঘ পরিকল্পনা, একাধিক সংশোধন ও নানা চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে বাস্তবায়িত এই প্রকল্প শুধু কক্সবাজারকে রেল যোগাযোগের আওতায় আনেনি, বরং পর্যটন, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক অর্থনীতির বিকাশেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের বাস্তবতা পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে রামু–গুন্দুম অংশ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তে সরকারের প্রায় ৬ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

২০১০ সালের ৬ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হতে মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন গুন্দুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন পায়। সে সময় প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। তবে সময়ের সঙ্গে নকশা পরিবর্তন, প্রকল্প সংশোধন, নির্মাণব্যয় বৃদ্ধি, ভূমি অধিগ্রহণ এবং আধুনিক অবকাঠামো সংযোজনের কারণে ব্যয় বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকায় পৌঁছে।

প্রকল্পের আওতায় দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত প্রায় ১০২ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মিত হয়েছে দেশের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশন, একাধিক নতুন স্টেশন, অসংখ্য সেতু, কালভার্ট এবং অত্যাধুনিক রেল অবকাঠামো। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে দুইটি প্যাকেজে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে এই রেলপথ উদ্বোধন করলে দেশের রেল যোগাযোগে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

প্রকল্পের মূল পরিকল্পনায় রামু থেকে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী গুন্দুম পর্যন্ত প্রায় ২৮ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা। কিন্তু গত এক দশকে মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সীমান্ত নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি, আন্তঃদেশীয় রেল সংযোগে অগ্রগতির অভাব এবং পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ওই অংশের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দেয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। পরিবর্তিত বাস্তবতা বিবেচনায় রামু–গুন্দুম অংশটি আপাতত মূল প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ফলে প্রায় ৬ হাজার ৬৮২ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সিদ্ধান্ত প্রকল্পকে আরও বাস্তবসম্মত ও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর করেছে।

প্রকল্পটির দীর্ঘ বাস্তবায়ন সময়ে সাবেক প্রকল্প পরিচালক  সুবক্তগীন দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সুবক্তগিন। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর দায়িত্বকালে প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন প্রশাসনিক সমন্বয়, অগ্রগতি তদারকি এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতি আসে। একই সময়ে রামু–গুন্দুম অংশ পুনর্মূল্যায়নের প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়া হয়, যা সরকারের বিপুল অর্থ সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথ শুধু একটি পরিবহন প্রকল্প নয়; এটি দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম ভিত্তি। রেল সংযোগ চালুর ফলে পর্যটন শিল্পে নতুন গতি এসেছে, পণ্য পরিবহন সহজ হয়েছে, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যে যাতায়াত সময় কমেছে এবং ভবিষ্যতে আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগও তৈরি হয়েছে।

তারা আরও বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অনুকূলে এলে ভবিষ্যতে রামু–গুন্দুম অংশ পুনরায় বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও নতুন করে উন্মোচিত হবে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় প্রয়োজনীয় অংশ বাস্তবায়ন এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এড়িয়ে প্রকল্প সম্পন্ন করার মাধ্যমে সরকারের অর্থনৈতিক দক্ষতা ও পরিকল্পনার বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিই প্রতিফলিত হয়েছে।

দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথ আজ দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, পর্যটনের বিকাশ, আঞ্চলিক অর্থনীতির সম্প্রসারণ এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার সমন্বয়ে এই প্রকল্প ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।