রেলে প্রভাবের রাজনীতি ও বিতর্কিত পদোন্নতি: এডিজি (ডেভেলপমেন্ট) মামুনুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়ন কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ অতিরিক্ত মহাপরিচালক (ডেভেলপমেন্ট)। বর্তমানে এ দায়িত্ব পালন করছেন মামুনুল ইসলাম। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার এবং অধস্তন কর্মকর্তাদের ওপর অনৈতিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অতীতে পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই মামুনুল ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ছিল। সম্প্রতি পাওয়া একটি কথোপকথনের অডিও রেকর্ডেও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যয় ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ

খবরের কাগজের হাতে আসা একটি অডিও রেকর্ডে শোনা যায়, একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার অধস্তন এক প্রকল্প কর্মকর্তার কাছে তিনটি দাবি জানান—নগদ অর্থ, অফিসিয়াল গাড়ির ট্যাক্স-টোকেন নবায়ন এবং গাড়ির জ্বালানি সরবরাহ। কথোপকথনে তিনি প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার করে এসব ব্যয় নির্বাহের নির্দেশ দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অডিওতে শোনা যায়, তিনি বলেন—

“তিনটা জিনিস বললাম। একটা হলো টাকা। দুই নম্বর ট্যাক্স-টোকেন এক বছরের জন্য করে দাও তোমাদের প্রকল্পের টাকা দিয়ে। আর তিন নম্বর হলো, গাড়ির ট্যাংক ফুল ভরে দাও।” সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দাবি, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ অমান্য করার সুযোগ না থাকায় তিনি শেষ পর্যন্ত ওই ব্যয় নির্বাহ করতে বাধ্য হন।

সরকারি বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক?

রেলওয়ের পরিবহন নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো রাজস্ব খাতভুক্ত পদের অনুকূলে বরাদ্দকৃত সরকারি গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, ট্যাক্স-টোকেন ও জ্বালানি ব্যয় সংশ্লিষ্ট রাজস্ব বাজেট থেকেই বহনের কথা। উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ এ ধরনের কাজে ব্যবহার করা আর্থিক বিধিবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে মনে করছেন প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।

পদোন্নতি গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন ঘিরে নতুন বিতর্ক

রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, বর্তমানে রেল ভবনে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (ডেভেলপমেন্ট) হিসেবে কর্মরত মামুনুল ইসলাম আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে দায়িত্ব পেতে বিভিন্ন মহলে তদবির চালাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের পছন্দের পদে নিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে রেলওয়ের অভ্যন্তরে আলোচনা রয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই সম্ভব হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, অতীতে তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ, বিতর্কিত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হলে তা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ও সুশাসনের জন্য নেতিবাচক বার্তা বয়ে আনতে পারে।

রেলওয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী বলেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা, দক্ষতা, সততা এবং পেশাগত রেকর্ডকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তাদের ভাষ্য, যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, সেসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে নিষ্পত্তির আগে তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভুল বার্তা যেতে পারে।

সুশাসন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উচ্চপদে নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করা জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এভাবে লেখা হলে প্রতিবেদনটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসরণ করবে এবং অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই উপস্থাপন করবে, প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে নয়। যদি আপনার কাছে সরকারি নথি, অডিওর ফরেনসিক যাচাই, দুদকের তথ্য বা আদালতের নথি থাকে, সেগুলোর ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে। সাবেক রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল বাকী এ বিষয়ে বলেন, কোনো কর্মকর্তার পদ অনুযায়ী বরাদ্দকৃত গাড়ির ব্যয় প্রকল্পের অর্থ থেকে বহন করা নিয়মসম্মত নয়। এমনটি হয়ে থাকলে তা অনিয়মের শামিল।

পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন

রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, মামুনুল ইসলামকে পশ্চিমাঞ্চলের জিএম (চলতি দায়িত্ব) পদে নিয়োগ দেওয়ার সময় তার চেয়ে জ্যেষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তাকে পাশ কাটানো হয়েছিল। যদিও মামুনুল ইসলাম এ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, নির্ধারিত সময়ের পরই তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে এবং কোনো কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে নয়।

প্রভাব খাটানোর অভিযোগ

রেলওয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অতীতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, বদলি, পদায়ন ও বিভিন্ন দাপ্তরিক বিষয়ে মামুনুল ইসলামের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ অস্বীকার

মামুনুল ইসলাম সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার বিরুদ্ধে দুদকে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। বিদেশি নাগরিকত্ব কিংবা প্রভাব খাটিয়ে পদোন্নতির অভিযোগও তিনি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।

তদন্তের দাবি

রেলওয়ের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করেন, অভিযোগগুলো যেহেতু সরকারি অর্থের ব্যবহার, প্রশাসনিক আচরণ এবং আর্থিক শৃঙ্খলার সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে অডিও রেকর্ডের সত্যতা যাচাই, প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের নথি পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা জরুরি। জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত হওয়াই জনস্বার্থের দাবি।

পদোন্নতি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ঘিরে নতুন বিতর্ক

রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, বর্তমানে রেল ভবনে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (ডেভেলপমেন্ট) হিসেবে কর্মরত মামুনুল ইসলাম আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে দায়িত্ব পেতে বিভিন্ন মহলে তদবির চালাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের পছন্দের পদে নিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে রেলওয়ের অভ্যন্তরে আলোচনা রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, অতীতে তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ, বিতর্কিত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হলে তা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ও সুশাসনের জন্য নেতিবাচক বার্তা বয়ে আনতে পারে।

রেলওয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী বলেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা, দক্ষতা, সততা এবং পেশাগত রেকর্ডকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তাদের ভাষ্য, যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, সেসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে নিষ্পত্তির আগে তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভুল বার্তা যেতে পারে।

সুশাসন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উচ্চপদে নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করা জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।