পদ্মা নদীর নাব্য সংকট ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে বহুল প্রত্যাশিত রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর। সম্ভাবনাময় এ নৌবন্দর চালু হলে বছরে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য, বিপুল কর্মসংস্থান এবং পরিবহন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হলেও নানা কারণে এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সুলতানগঞ্জ থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের মায়া নৌবন্দরের দূরত্ব মাত্র ১৮ কিলোমিটার। এই নৌপথটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে ভারত থেকে পাথর, মার্বেল, খনিজ বালু ও খাদ্যসামগ্রী আমদানির পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে বস্ত্র, মাছ ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির এক বিশাল দিগন্ত উন্মোচিত হবে। স্থলপথের তুলনায় নৌপথে পণ্য পরিবহনে প্রতি টনে প্রায় ৬ ডলার পর্যন্ত খরচ কমবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং স্থানীয় বাজারে পণ্যের দাম কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে।
এক বছরেও আলোর মুখ দেখেনি উপদেষ্টার নির্দেশনা
নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আগে এই নৌরুটে নিয়মিত বাণিজ্য চলত। কিন্তু যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে সেই নৌপথ ও নদীবন্দর বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ প্রায় ছয় দশক পর ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সুলতানগঞ্জ-ধূলিয়ান নৌপথে পুনরায় পণ্য আমদানি-রপ্তানি শুরু হয়। কিন্তু মাত্র ১০ দিন সচল থাকার পর পদ্মার নাব্য সংকটের কারণে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে নৌরুটটি সংক্ষিপ্ত করে সুলতানগঞ্জ থেকে মায়া বন্দর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়।
সবশেষ ২০২৫ সালের ১ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের নৌপরিবহন উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন সুলতানগঞ্জ পোর্ট অব কল পরিদর্শন করে দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন ও বন্দর চালুর নির্দেশনা দেন। তবে এই নির্দেশনার প্রায় এক বছর পার হতে চললেও এখনও আলোর মুখ দেখেনি বন্দরটি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নদী ড্রেজিং ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে পুরো কার্যক্রম ঝুলে রয়েছে। অথচ এনবিআরের শর্ত মেনে ব্যবসায়ীরা নিজস্ব অর্থায়নে অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করতেও প্রস্তুত।
লোকসানের মুখে ব্যবসায়ীরা, সিন্ডিকেটের শঙ্কা
বন্দরটি চালু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় আমদানিকারকরা। পাথর আমদানিকারক আমিনুল ইসলাম জানান, নিজেদের উদ্যোগে অবকাঠামো গড়ে তুললেও আমাদের পণ্যবাহী জাহাজ মাসের পর মাস ঘাটে পড়ে আছে। প্রতি মাসে জাহাজপ্রতি প্রায় ১৫ লাখ টাকা ভাড়া গুনতে হচ্ছে। দ্রুত বন্দর চালু না হলে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে ভারত থেকে সড়ক বা রেলপথে পাথর আনতে হয়, যা ব্যয়বহুল। নৌপথে আমদানি করা গেলে খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমবে। বর্ষা মৌসুমে দুই থেকে আড়াই হাজার টন এবং শুষ্ক মৌসুমে ৭০০ থেকে ৮০০ টন পণ্য পরিবহনের সুযোগ রয়েছে।
আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, সুলতানগঞ্জ বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি করা গেলে টনপ্রতি প্রায় ৬ ডলার পর্যন্ত খরচ কমবে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, পণ্যের দাম কমবে এবং এই অঞ্চলে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি ভারী ট্রাকে পাথর পরিবহনের ফলে সড়কের ক্ষতি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমে আসবে।
আরেক আমদানিকারক সুলতানুল ইসলাম তারেক বলেন, কেউ কেউ মনে করছেন সুলতানগঞ্জ বন্দর চালু হলে অন্য বন্দরের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাস্তবে যার যেদিক দিয়ে সুবিধা হবে, সেদিক দিয়েই পণ্য আমদানি-রপ্তানি করবেন। এতে সরকার দুই বন্দর থেকেই রাজস্ব পাবে। তাই দ্রুত এখানে কাস্টমস কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন।
কী বলছেন কর্তৃপক্ষ
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন বলেন, সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও কেন চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এর পেছনে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কায়েমি স্বার্থ জড়িত আছে কি না, সেটিও দেখা দরকার।
এ বিষয়ে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু জানান, সারা দেশের মতো রাজশাহীর উন্নয়ন ও সমস্যাগুলোকে সরকার গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। সুলতানগঞ্জ নৌবন্দরের জটিলতা নিরসনে দ্রুতই সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।