অবক্ষয়ের অতলে মফস্বল সাংবাদিকতা: নিয়োগ বাণিজ্য, চাঁদাবাজি,আইডি কার্ড বিক্রির মহোৎসব

সাংবাদিকতাকে বলা হয় সমাজের দর্পণ এবং রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এটি একটি মহান এবং অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পেশা। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের মফস্বল বা তৃণমূল পর্যায়ের সাংবাদিকতায় যে চিত্রটি ফুটে উঠছে, তা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং লজ্জাজনক। একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই মহান পেশাটি কিছু অসাধু গণমাধ্যম মালিক এবং নীতিহীন একশ্রেণীর মানুষের কারণে চরম নৈতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।

বিনা বেতনের মফস্বল সাংবাদিকতা ও দুর্নীতির উৎস
মফস্বল বা উপজেলা পর্যায়ে যারা সাংবাদিকতা করেন, তাদের সিংহভাগের কোনো নির্দিষ্ট বেতন-ভাতা নেই। অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম (বিশেষ করে নতুন গজিয়ে ওঠা স্যাটেলাইট ও আইপি টিভি এবং অনলাইন পোর্টাল) মফস্বল প্রতিনিধিদের কোনো আর্থিক সুবিধা দেয় না। অথচ পেশাগত দায়িত্ব পালনে তাদের প্রতিদিন যাতায়াত, তথ্য সংগ্রহ এবং যোগাযোগের পেছনে নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করতে হয়। প্রশ্ন ওখানেই জাগে যেখানে কোনো বেতন নেই, সেখানে বিপুল অঙ্কের টাকা কখনো কখনো ৫০ হাজার থেকে লাখ টাকা) ঘুষ বা ‘টোকেন মানি’ দিয়ে টিভির নিয়োগপত্র বা আইডি কার্ড কেনা হচ্ছে কীভাবে?

বেতনহীন এই পদের জন্য টাকা বিনিয়োগের উৎস এবং উদ্দেশ্য কী?
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই পেশাকে একশ্রেণীর মানুষ ‘লাইসেন্স’ বা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। বেতন না থাকায় টিকে থাকার জন্য এবং বিনিয়োগ করা টাকা তুলতে তারা মফস্বল এলাকায় নানা ধরনের দুর্নীতি, দালালি, তদবির বাণিজ্য এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সাথে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছে, অথবা স্বেচ্ছায় জড়িয়ে পড়ছে।

আইডি কার্ড বিক্রির হাট ও পারিবারিক চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট
সাম্প্রতিক সময়ে মফস্বল সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো শিক্ষাগত যোগ্যতা বা মেধার কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই কেবল টাকার বিনিময়ে গণমাধ্যমের পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) বিতরণ করা হচ্ছে। গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষ বা সম্পাদকরা যাচাই করছেন না যে, কার্ড গ্রহীতা লিখতে বা পড়তে পারেন কি না। পারিবারিক সিন্ডিকেট: এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মফস্বলের অনেক অসাধু ব্যক্তি নিজের পাশাপাশি পরিবারের একাধিক সদস্যকে (ভাই, ছেলে বা আত্মীয়-স্বজন) সাংবাদিক বানিয়ে ফেলছেন। একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি যখন ‘সাংবাদিক’ পরিচয়পত্র পেয়ে যান, তখন তারা এলাকাভিত্তিক একটি শক্তিশালী চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা এখন এদের নিত্যদিনের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই সব পরিবারের নতুন প্রজন্ম বা সন্তানরা চোখের সামনে তাদের অভিভাবকদের এই অনৈতিক কর্মকাণ্ড দেখে বড় হচ্ছে। তারা শিখছে কীভাবে সাংবাদিকতার আড়ালে অর্থ আত্মসাৎ ও অপকর্ম করতে হয়। এর চেয়ে লজ্জাজনক এবং ঘৃণ্য চিত্র একটি সভ্য সমাজের জন্য আর হতে পারে না।

শিক্ষাগত যোগ্যতার অভাব:গরুর রচনা লেখার যোগ্যতাও নেই যাদের
আজকের দিনে সাংবাদিকতায় আসতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট বা ন্যূনতম যোগ্যতার কড়াকড়ি নেই বললেই চলে। অথচ এই পেশার জন্য প্রয়োজন সুশিক্ষিত, মার্জিত এবং বিবেকবান মানুষ।
বাস্তবতা হলো, টাকার বিনিময়ে কার্ড নেওয়া অনেক মফস্বল ‘সাংবাদিক’কে যদি আজ ইংরেজিতে নিজের নাম-ঠিকানা লিখতে দেওয়া হয়, কিংবা বাংলায় একটি সাধারণ ‘গরুর রচনা’ বা সংবাদ প্রতিবেদন লিখতে বলা হয়, তবে তারা মাঠ ছেড়ে পালাবেন। যারা নিজের ভাষা ও বানানের ওপর ন্যূনতম দখল রাখেন না, তারা সমাজের অনিয়ম নিয়ে কীভাবে প্রতিবেদন তৈরি করবেন? এই অযোগ্যতাই সাংবাদিকতার মানকে তলানিতে নিয়ে ঠেকেছে।

সম্পাদকদের ভূমিকা ও ধিক্কার
মফস্বলের এই সামগ্রিক ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে মূল দায় কিন্তু ঢাকা বা বিভাগীয় শহরের বসে থাকা একশ্রেণীর সম্পাদক ও গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষের। তারা মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন না করে, সংবাদপত্রের নীতি নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে কেবল টাকার লোভে কার্ড বিক্রি করছেন। যারা টাকার বিনিময়ে এই মহান পেশাকে কলঙ্কিত করছেন, সেসব সম্পাদক ও নীতিনির্ধারকদের প্রতি সচেতন সমাজ তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানাচ্ছে।

উত্তরণের উপায়
মফস্বল সাংবাদিকতাকে এই ভয়াবহ পতন থেকে রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
* ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ: সাংবাদিকতায় যোগ দেওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং লিখিত পরীক্ষার নিয়ম বাধ্যতামূলক করতে হবে।* আইডি কার্ড বাণিজ্য বন্ধ: টাকার বিনিময়ে কার্ড দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং তথ্য মন্ত্রণালয় বা প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে কঠোর নজরদারি চালাতে হবে।
* ওয়েজবোর্ড ও বেতন নিশ্চিতকরণ: মফস্বল সাংবাদিকদের জন্য ন্যূনতম বেতন-ভাতা ও যাতায়াত খরচ দেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে তারা সততার সাথে কাজ করতে পারেন।
* প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা: সাংবাদিক পরিচয়ে যারা চাঁদাবাজি বা অপকর্ম করবে, তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। সাংবাদিকতা কোনো ব্যবসার হাতিয়ার বা চাঁদাবাজির লাইসেন্স নয়। এই পেশার মর্যাদা ধরে রাখতে হলে এখনই কলঙ্কিত ও ভুয়া সাংবাদিকদের ছাঁটাই করে শিক্ষিত ও সৎ যুবসমাজকে এগিয়ে আসার সুযোগ করে দিতে হবে।