৩ আগস্টের সেই ‘এক দফা’ বদলে দিয়েছিল পুরো আন্দোলনের গতিপথ

জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন ৩ আগস্ট। সেদিনই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে আসে ঐতিহাসিক এক দফা ঘোষণা। এতে পাল্টে যায় আন্দোলনের গতিপথ এবং তৈরি হয় গণঅভ্যুত্থানের শক্ত ভিত্তি। তবে সমন্বয়কদের জন্য সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া একেবারেই সহজ ছিল না। নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদের দাবি, শুরুতে এই সিদ্ধান্তের কথা কোনো রাজনৈতিক দলই জানত না।
২০২৪ সালের ৩ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে নেমেছিল মানুষের জনসমুদ্র। সেই বিশাল সমাবেশ থেকেই আসে শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবি। তবে এই ঘোষণা দেওয়ার বিষয়টি সহজ ছিল না। সমন্বয়করা জানান, তীব্র দমন-পীড়নের আশঙ্কা মাথায় নিয়েই সেদিন শহীদ মিনারে সমবেত হয়েছিলেন তারা।
এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেন, ‘সবাই জীবন ও ঝুঁকি নিয়েই ওইদিন সিদ্ধান্ত নিই যে শহীদ মিনারে গিয়ে এক দফা ঘোষণা করা হবে। আমরা সবাই বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয়ে ছিলাম, সেখান থেকেই এক দফা ঘোষণার উদ্দেশ্যে শহীদ মিনারে আসি।’
অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম জানান, ‘আমাদের মূলত সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল, যেন আমরা সরকারের সাথে কোনোভাবেই সহযোগিতা না করি। এর অধীনে ১০-১২টির মতো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ছিল।’
এক দফার সিদ্ধান্তটি নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমেই নিয়েছিলেন সমন্বয়করা। শুরুতে এতে কোনো রাজনৈতিক দলের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা ছিল না, তবে পরবর্তীতে আন্দোলনে যুক্ত অন্যান্য ছাত্র সংগঠন ও বিভিন্ন অংশীজনকে বিষয়টি জানানো হয়।
এই প্রসঙ্গে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া আরও বলেন, ‘আমাদের যে ১৫-২০ জনের মূল সমন্বয়ক দল ছিল, তাদের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে দফায় দফায় বৈঠক হচ্ছিল। আন্দোলনের সেন্ট্রাল ফিগার হিসেবে অর্গানিকভাবেই নাহিদ ইসলামের নাম উঠে এসেছিল, তাই উনিই এক দফা ঘোষণা করবেন—এ বিষয়ে সবাই একমত হন। তবে সরকার পতনের এক দফা ঘোষণার বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যেই একটা সুনির্দিষ্ট ঐক্য বা কনসেন্সাস ছিল। আন্দোলন চলাকালীন এর সঠিক ভাষা বা বক্তব্য কী হবে, তা নিয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যে অনেক আলোচনা করতে হয়েছে।’
নাহিদ ইসলাম আরও যোগ করেন, ‘এই আন্দোলন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়েছে এবং এখানকার লিডারশিপ সম্পূর্ণ স্পষ্ট ছিল। তবে এতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সব স্তরের অংশগ্রহণ ছিল। সে সময় কেউ কোনো বিশেষ রাজনৈতিক পরিচয়ে আসেননি; বরং তখন সবাই নিজ নিজ রাজনৈতিক পরিচয় লুকিয়েছে।’
৩ আগস্টের শহীদ মিনারের সেই অভূতপূর্ব জনসমাগম আন্দোলনে এক নতুন গতির সঞ্চার করেছিল। সেখান থেকেই তৈরি হয়েছিল সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচির অভূতপূর্ব জনসমর্থন, যা পরবর্তীতে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের শক্ত ভিত্তি গড়ে দেয়।