মাতারবাড়ীতে ১ বিলিয়ন ডলারের পরিবেশবান্ধব ডকইয়ার্ড নির্মাণে চূড়ান্ত অনুমোদন

নিজস্ব প্রতিবেদক: মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে দেশের সামুদ্রিক অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের লক্ষ্যে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে পরিবেশবান্ধব ‘Matarbari Green Dockyard & Shipbuilding Facility’ নির্মাণে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটির কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নের জন্য এটি ইতোমধ্যে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

জানা গেছে, প্রকল্পটি সম্পূর্ণ ‘ল্যান্ডলর্ড মডেল’-এর আওতায় বাস্তবায়িত হবে। এ প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত প্রায় ২০০ একর জমি ও স্থাবর সম্পদের মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) কাছেই থাকবে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষে নির্মিত সব অবকাঠামো স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় হস্তান্তর করা হবে। পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে বেসরকারি বিনিয়োগে, ফলে সরকারের ওপর কোনো ঋণের বোঝা তৈরি হবে না।

রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী ডকইয়ার্ড শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত হলেও প্রকল্পটির কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় গত ৭ জুন অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় শিল্প মন্ত্রণালয় অনাপত্তিপত্র (এনওসি) প্রদান করে। এর ফলে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা দূর হয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ সুগম হয়েছে।

প্রকল্পটির প্রধান বিনিয়োগকারী হিসেবে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার AIS Marine Investments Pty Ltd

বন্দরের সক্ষমতা বাড়াবে ডকইয়ার্ড

প্রস্তাবিত ডকইয়ার্ডটি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, দেশের অন্যান্য সমুদ্রবন্দর এবং বঙ্গোপসাগরে চলাচলকারী বড় বাণিজ্যিক জাহাজের ডকিং ও জরুরি মেরামত সুবিধা নিশ্চিত করবে। এর ফলে দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজ দীর্ঘ সময় বন্দর চ্যানেলে আটকে থাকার ঝুঁকি কমবে এবং বন্দরের কার্যক্রম আরও নিরাপদ ও গতিশীল হবে।

প্রকল্পের অন্যতম আকর্ষণ হবে ৬০০ মিটার দীর্ঘ ও ৯৫ মিটার প্রশস্ত আধুনিক ড্রাই ডক। এটি নির্মিত হলে বর্তমানে সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা চীনে গিয়ে যেসব ভারী জাহাজ মেরামত করতে হয়, সেগুলো বাংলাদেশেই মেরামত করা সম্ভব হবে। এতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ আঞ্চলিক Maritime Service Hub হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পাবে।

পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার

দেশের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ‘গ্রিন ডকইয়ার্ড’ হিসেবে প্রকল্পটিতে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (IMO)-এর Net Zero Framework, Green Voyage 2050 এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে। এতে স্বল্প-কার্বন নির্গমন প্রযুক্তি, ক্লোজড-লুপ বর্জ্য পানি শোধন ব্যবস্থা এবং আধুনিক বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ৮, ৯, ১৩ ও ১৪ অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব

প্রকল্পটির মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ জন প্রকৌশলী ও দক্ষ কারিগরের সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি আরও প্রায় ২ হাজার ৬০০ জনের পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এছাড়া স্থানীয় প্রকৌশল শিল্প, ইস্পাত, লজিস্টিকস ও সামুদ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিকাশেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

এ ডকইয়ার্ডে বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড এবং দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ বিশ্বমানের মেরামত সুবিধা পাবে, যা জাতীয় নিরাপত্তা এবং দেশের সামুদ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চূড়ান্ত অনুমোদনের পর বর্তমানে পিপিপি কর্তৃপক্ষ প্রকল্পটির কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। সম্পূর্ণ বেসরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত এ মেগা প্রকল্পটি বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমি, পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।