চারদিকে শুধুই পানি, ১৩ প্রাণহানি

১ লাখ ৪৭ হাজার পরিবার পানিবন্দী, বাঁশখালীসহ বিভিন্ন উপজেলায় চরম খাদ্য ও বিদ্যুৎ সংকট ; দুর্যোগের সুযোগে নগরীতে অবৈধ পাহাড় কাটার মহোৎসব|

টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের কারণে বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ পুরো জেলায় এক ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে| চারদিকে থই থই পানি, তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলের মাঠ| এখন পর্যন্ত ১৩ জনের মৃত্যু ও আহত হয়েছেন ১২ জন| জেলার ১৬টি উপজেলা ও মহানগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে প্রায় ৫ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন|
গত শনিবার রাত থেকে শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টিতে নগরীর চকবাজার, কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ ও বাকলিয়াসহ বিভিন্ন নিচু এলাকায় নতুন করে তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে| তবে রবিবার সকাল থেকে বৃষ্টি কিছুটা কমে আসায় ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করেছে| আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আজ সোমবার থেকে ভারী বৃষ্টির প্রবণতা কমবে| তবে সমুদ্রবন্দরের জন্য জারি করা ৩ ন¤^র স্থানীয় সতর্ক সংকেত ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে|
মহানগরীর তুলনায় চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোর বন্যা পরিস্থিতি সবচেয়ে মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে| বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার গুনাগরী, কোকদণ্ডী, ইলশা, চাঁপাছড়ি, বাহারছড়া ও দিঘীরপাড়ার মতো এলাকাগুলো এখন সম্পূর্ণ জলমগ্ন| কোকদণ্ডী এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন পুরোপুরি জলাশয়, মাঠের সবুজ ধানের ডগাগুলো শুধু পানির ওপর উঁকি দিচ্ছে| বানের পানিতে উপজেলার অধিকাংশ মাটির ঘর ধুয়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে| পশ্চিম চাঁপাছড়ির ভেল্লাপাড়ায় মোক্তার এবং দিঘীরপাড়ায় আবছার, জাফর, জামাল ও ফোরকানের মাটির ঘর পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে| তিন দিন ধরে কোনো বিদ্যুৎ নেই, চারদিকে দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট| মুরগির খামারগুলো ভেসে গেছে, মারা গেছে বহু গবাদিপশু|
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে জেলার ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫০০টি পরিবার সম্পূর্ণ পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে| দুর্গত মানুষের জন্য জেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে ৫৮০টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করেছে, যেখানে প্রায় ২১ হাজার ৯০০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন| তবে বাঁশখালীসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মীয়ের বাড়ি বা উঁচু সড়কে পলিথিনে মোড়ানো শেষ স¤^লটুকু নিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন| দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন চাল ও ৮৫ লাখ টাকা নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে| খাদ্যসংকট মোকাবিলায় দুর্গত মানুষের মধ্যে এ পর্যন্ত ৩৯ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১৫ হাজার ১০০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে|
বন্যাকবলিত উপজেলাগুলোতে পানিবন্দী মানুষকে উদ্ধার ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী| বিশুদ্ধ পানি, খাদ্যসামগ্রী ও ত্রাণের পাশাপাশি বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবাও দেওয়া হচ্ছে| আইএসপিআর জানিয়েছে, সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশন, ১০ পদাতিক ডিভিশন ও ৭ ¯^তন্ত্র এডি ব্রিগেডের সদস্যরা বোয়ালখালী, আনোয়ারা, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িতে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন| এদিকে রবিবার চট্টগ্রামের চান্দগাঁও সিএন্ডবি ও মোহরা এলাকার পানিবন্দী মানুষের খোঁজখবর নেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত| তিনি জানান, পরিস্থিতি ¯^াভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সর্বত্র প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত থাকবে|
দুর্যোগের এই অন্ধকার ও বৃষ্টিকে পুঁজি করে নগরীতে চলছে আরেক নিষ্ঠুর ধ্বংসযজ্ঞ| জালালাবাদ, কাঁঠাল বাগান আর বড়ই বাগান এলাকায় অবৈধভাবে নির্বিচারে পাহাড় কাটছে একটি ¯^ার্থাšে^ষী মহল| পাহাড়ের মাটি ধসে এসে এলাকার ড্রেন ও নালাগুলো বন্ধ হয়ে তীব্র কৃত্রিম জলাবদ্ধতা ˆতরি করছে| এলাকাবাসীর অভিযোগ, সানি হুজুর, সালাহউদ্দিন, ঢাকাইয়া সুমন এবং আমির হোসেনের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এই পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত| পরিবেশ অধিদপ্তরকে বারবার জানানো হলেও রহস্যজনক কারণে তারা নির্বিকার| পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এভাবে পাহাড় কাটা অব্যাহত থাকলে চট্টগ্রামে তীব্র অক্সিজেন সংকট দেখা দেবে এবং পাহাড়ধসে বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়বে|
টানা ভারী বর্ষণে রেললাইন ২০ ইঞ্চি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া এবং গাছ উপড়ে পড়ার কারণে দীর্ঘ পাঁচ দিন বন্ধ থাকার পর অবশেষে সচল হয়েছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ| গতকাল রোববার দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটে ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ ট্রেনের যাত্রার মধ্য দিয়ে এই রুটে ট্রেন চলাচল ¯^াভাবিক হয়| গত মঙ্গলবার যে ট্রেনটি ষোলশহর-জানালীহাট সেকশনে আটকে পড়েছিল, রবিবার সেটিই আবার ¯^াভাবিকভাবে যাত্রা শুরু করায় বিষয়টিকে অনেকটা প্রতীকী হিসেবে দেখছেন যাত্রীরা| এই পথে ট্রেন চলাচল ¯^াভাবিক হওয়ায় হাজারো পর্যটক ও সাধারণ যাত্রীদের ˆদনন্দিন যাতায়াতে ¯^স্তি ফিরে এসেছে|