প্যারালাইসিসে শয্যাশায়ী শামসুন নাহার, ভরণপোষণ নিয়ে দুই ছেলের বিরোধ আদালতে
দায়িত্ব নেওয়ার দ্বন্দ্বে অসহায় মা
বিছানায় পড়ে আছেন শামসুন নাহার। প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে নিজের প্রয়োজনেও অন্যের ওপর নির্ভরশীল তিনি। স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই ছেলেকেই জীবনের শেষ আশ্রয় ভেবেছিলেন। অথচ মায়ের ভরণপোষণ ও দেখভালের দায়িত্ব কে নেবেন—এ নিয়ে দুই ছেলের বিরোধ এখন গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। আর সেই বিরোধের মাঝেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, ওষুধ ও পরিচর্যা নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাঁর।
চট্টগ্রাম নগরীর একটি ভাড়া বাসায় দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী অবস্থায় দিন কাটছে শামসুন নাহারের। প্যারালাইসিসের কারণে তিনি নিজে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াতে পারেন না। খাবার খাওয়া, ওষুধ সেবন, চিকিৎসা নেওয়া কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতেও তাঁকে অন্যের সহায়তা নিতে হয়।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, স্বামী আসলাম মারা যাওয়ার পর সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন শামসুন নাহার। তাঁর বড় ছেলে শাহজাহান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী। ছোট ছেলে হানিফও রয়েছেন। তবে মায়ের দায়িত্ব নেওয়া নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলছে। এর প্রভাব পড়ছে অসুস্থ মায়ের জীবনযাপনেও।
ভরণপোষণের বিরোধ আদালতে
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মায়ের ভরণপোষণ নিয়ে বিরোধের জেরে মামলা হয়েছে। মামলায় মাসিক তিন হাজার টাকা করে ভরণপোষণ দেওয়ার সম্মতি দিয়ে জামিন নেওয়া হয়েছিল বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। তবে তাঁদের অভিযোগ, জামিন পাওয়ার পর ওই অর্থ নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে না।
ফলে শামসুন নাহারের চিকিৎসা, ওষুধ ও দৈনন্দিন খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ছোট ছেলে হানিফের বিরুদ্ধেও মামলা চলমান রয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে মামলার অভিযোগ ও ভরণপোষণ সংক্রান্ত বিষয় আদালতের নথি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
মেয়েরাও পাশে, সামর্থ্য সীমিত
শামসুন নাহারের দুই মেয়েও মায়ের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন। কিন্তু নিজেদের সংসারের ব্যয় সামলাতেই তাঁদের হিমশিম খেতে হয়। ফলে অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা ও সার্বক্ষণিক পরিচর্যার পুরো দায়িত্ব নেওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকায় শামসুন নাহারের নিয়মিত চিকিৎসা, ওষুধ ও পরিচর্যা প্রয়োজন। তাঁর জন্য নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। কিন্তু পারিবারিক বিরোধের কারণে এসব প্রয়োজন সবসময় পূরণ হচ্ছে না বলে অভিযোগ তাঁদের।
সন্তানদের কাছেই শেষ আশ্রয়
স্বামীকে হারানোর পর জীবনের শেষ সময়টা সন্তানদের কাছেই কাটানোর প্রত্যাশা ছিল শামসুন নাহারের। কিন্তু সন্তানদের দায়িত্ব নেওয়ার বিরোধে সেই প্রত্যাশাই এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
অসুস্থ এই মায়ের চাওয়া, কোনো পক্ষের সঙ্গে বিরোধ নয়—নিয়মিত খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসা এবং একটু যত্ন। জীবনের এই শেষ সময়ে সন্তানদের কাছ থেকে ন্যূনতম নিরাপত্তা ও সহায়তাই তাঁর প্রত্যাশা।
স্থানীয়দের মতে, পারিবারিক বিরোধ বা আইনি লড়াই যাই থাকুক, একজন শয্যাশায়ী মায়ের ন্যূনতম ভরণপোষণ ও চিকিৎসা যেন ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি তাঁর চিকিৎসা ও নিরাপদ জীবনযাপনের ব্যবস্থা করাও প্রয়োজন।
একসময় যাঁর কাছে সন্তানরাই ছিল জীবনের শেষ আশ্রয়, আজ সেই সন্তানদের দায়িত্ব নেওয়ার দ্বন্দ্বেই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাঁর শেষ বয়স। আদালতের লড়াইয়ের বাইরে এখন সবচেয়ে জরুরি—শামসুন নাহারের নিয়মিত ভরণপোষণ, চিকিৎসা ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা।