বিদেশগামী নাগরিকদের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দেওয়ার নামে প্রতারণা, সরকারি কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল এবং নকল ওয়েবসাইট ও QR কোড তৈরি করে ভুয়া সনদকে আসল হিসেবে উপস্থাপনের অভিযোগে সংঘবদ্ধ চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন— মো. আশরাফ আলী খান (৩৬), মো. নিশান (৩৬), মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন (৪৮) ও মো. আব্দুর রহমান (৪৬)।
জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা (ডিএসবি) ও জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) যৌথ অভিযানে বাঁশখালী ও চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
১ লাখ ২০ হাজার টাকায় ‘পুলিশ ক্লিয়ারেন্স’
পুলিশ জানায়, বিদেশগামী এক নাগরিকের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স প্রয়োজনের সুযোগ নেয় চক্রটি। দ্রুত ও সহজে সরকারি সনদ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা নেয় তারা।
পরে সরকারি কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে প্রকৃত পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের আদলে একটি ভুয়া সনদ তৈরি করা হয়।
QR কোড স্ক্যান করলেই খুলত নকল ওয়েবসাইট
জাল সনদটিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে চক্রটি ব্যবহার করে অভিনব কৌশল। প্রকৃত পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের QR কোডের আদলে নকল QR কোড তৈরি করা হয়। পাশাপাশি তৈরি করা হয় একটি ভুয়া ওয়েবসাইট।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, QR কোডটি স্ক্যান করলে সরকারি ওয়েবসাইটে যাওয়ার পরিবর্তে চক্রটির তৈরি নকল ওয়েবসাইটে সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রদর্শিত হতো। ফলে প্রাথমিকভাবে সনদটি আসল বলে মনে হওয়ার সুযোগ ছিল।
ভুক্তভোগীও জাল সনদটি প্রকৃত মনে করে সংশ্লিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সিতে জমা দেন। পরে এজেন্সির যাচাইয়ে সনদটি জাল বলে শনাক্ত হয়।
অভিযোগের পর তদন্তে বেরিয়ে আসে চক্রের তথ্য
বিষয়টি জানিয়ে ভুক্তভোগী চট্টগ্রামের পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় জেলা গোয়েন্দা শাখা তদন্ত শুরু করে।
তদন্তের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ, পারস্পরিক যোগাযোগ, অর্থ লেনদেন এবং ব্যবহৃত প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে চক্রটির সদস্যদের শনাক্ত করে অভিযান চালানো হয়।
পরে বাঁশখালী ও নগরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তাদের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে বাঁশখালী থানায় নিয়মিত মামলা করা হয়েছে।
চক্রে আরও কয়েকজন, অভিযান অব্যাহত
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে এই চক্রের সঙ্গে আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে একজন বাংলাদেশি নাগরিকের আইনগত অবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি হলো পুলিশ ক্লিয়ারেন্স। তাই সরকারি কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করা এবং নকল ওয়েবসাইট ও QR কোড ব্যবহার করে ভুয়া সনদ তৈরি শুধু আর্থিক প্রতারণা নয়; এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সরকারি নথির বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ জানিয়েছে, সরকারি নথি জালিয়াতি, প্রযুক্তির অপব্যবহার, প্রতারণা ও দালালচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
বিদেশগামী নাগরিকদের দালাল বা অবৈধ মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স না নিয়ে নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়ায় আবেদন ও সনদ যাচাইয়ের আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।