রপ্তানি খাতকে সহায়তা দিতে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির জন্য চালু করা হয়েছিল ফ্রি অব কস্ট বা এফওসি সুবিধা। তবে চট্টগ্রামে এই সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, এফওসি সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করা প্রায় ৪০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ১৪টির বিরুদ্ধে জাল নথি ব্যবহার এবং শুল্কমুক্ত কাঁচামাল স্থানীয় বাজারে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্টার নিউজের হাতে আসা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নথি পর্যালোচনায়ও উঠে এসেছে অনিয়মের চাঞ্চল্যকর তথ্য।
নথি অনুযায়ী, নগরীর স্যানটেক্স নিটওয়্যার্স লিমিটেড গত দুই বছরে চারটি ভুয়া প্রত্যয়নপত্র ব্যবহার করে প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের ৩৩২ টন কাপড় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স বাতিল এবং ফৌজদারি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে পুরোপুরি স্বীকার না করলেও স্যানটেক্স নিটওয়্যার্সের কমার্শিয়াল ম্যানেজার আবদুল করিম বলেন, আইনের ব্যত্যয় হয়ে থাকলে এর জন্য যে শাস্তি হবে, তা মেনে নেবেন তারা।
অন্যদিকে ফোকাস অ্যাপারেলস বিডি লিমিটেডের বিরুদ্ধে অভিযোগ আরও গুরুতর। তদন্তে উঠে এসেছে, আল ইউসরা টেক্সটাইল লিমিটেডের নামে একটি ভুয়া সাবকন্ট্রাক্ট চুক্তিপত্র ব্যবহার করে প্রায় ১৯ টন আমদানি করা কাপড় কারখানা থেকে বের করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়েছে। গত ২১ জুলাই সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে এসব অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছে কাস্টমস। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে সিইপিজেডভিত্তিক ফাল্গুন গ্রুপের জেএমএস গার্মেন্টস নিয়েও তদন্তে উঠে এসেছে বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য। বিপুল ঋণের বোঝায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কারখানাটি বন্ধ রয়েছে। সম্প্রতি সেখানে তদন্ত চালায় কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট।
তদন্তে দেখা যায়, বন্ড সুবিধায় আমদানি করা বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের হিসাব মিলছে না। গুদামে পাওয়া যায়নি প্রায় ৯ হাজার টন ফেব্রিক্স, ৫ হাজার টনের বেশি এক্সেসরিজ এবং ৬৭ টন প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়ালস। এসব কাঁচামাল খোলা বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি রপ্তানি আয়ের প্রায় ১১৮ কোটি টাকা দেশে ফেরত আনেনি বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। পরে ওই অর্থ বাধ্যতামূলক ঋণে রূপান্তর করেছে এক্সিম ব্যাংক। এর আগে ২০২০ সালেও শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, যা বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।
একই গ্রুপের আরেক প্রতিষ্ঠান মডিসড গার্মেন্টসের বিরুদ্ধেও শুল্ক ও কর ফাঁকির অভিযোগ এনেছে বন্ড কমিশনারেট। তবে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে এফওসি সুবিধার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন চট্টগ্রাম কাস্টমস ও বন্ড কমিশনারেটের সহকারী কমিশনার সুদীপ্ত মন্ডল গৌরব। তার দাবি, ফাল্গুন গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের কারণে সরকারের প্রায় ৭২২ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ব্যাখ্যা তলব করা হবে বলেও জানান তিনি।
কাস্টমস সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে বর্তমানে প্রায় ৪০ থেকে ৪২টি প্রতিষ্ঠান এফওসি সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে। এর মধ্যে অন্তত ১১টির বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি কাস্টমসের। এফওসি সুবিধার অপব্যবহার ঠেকাতে স্টক যাচাই, কাস্টমস কর্মকর্তাদের তদারকিতে কাপড় কাটা এবং উৎপাদন পর্যবেক্ষণসহ ১০টি নতুন কমপ্লায়েন্স শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
রপ্তানি খাতকে উৎসাহিত করতে দেওয়া শুল্কমুক্ত সুবিধা যাতে রাজস্ব ফাঁকি ও অবৈধ বাণিজ্যের হাতিয়ারে পরিণত না হয়, সে জন্য নজরদারি আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।