‘১২ বছরেও জলাবদ্ধতা কমে না, এত টাকা খরচ করে লাভ কী?’—নগরবাসীর ক্ষোভ

টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার সকাল থেকে নগরীর আগ্রাবাদ, পাঠানটুলী, বহদ্দারহাট, বাকলিয়া, চকবাজার, নিউমার্কেট, রিয়াজুদ্দিন বাজার, কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ ও রাহাত্তারপুলসহ বিভিন্ন এলাকায় কোথাও হাঁটুসমান, আবার কোথাও কোমরসমান পানি জমেছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ পথচারীরা।

নগরীর আগ্রাবাদ ও পাঠানটুলী এলাকায় হাঁটুসমান পানি ঠেলে চলাচল করতে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর জলাবদ্ধতা নিরসনে বিপুল অর্থ ব্যয় ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও পরিস্থিতির স্থায়ী কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।

পাঠানটুলীর বাসিন্দা সাজ্জাদ রাকিব বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নগরীর বাসিন্দাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। সামান্য বৃষ্টি হলেই ভোগান্তি বাড়ে। সারাবছরই উন্নয়নকাজ চললেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বৃষ্টি হলে ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে নগরীর অধিকাংশ রাস্তাঘাট ভাঙা। এই শহর আস্তে আস্তে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে।’

অফিসগামী রকি হায়দার বলেন, ‘দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীর যদি এই পরিণতি হয়, তাহলে এ দেশের মানুষ যাবে কোথায়? অফিসে আসতে হলো প্যান্টের বদলে লুঙ্গি পরে। এই ভোগান্তির শেষ কবে হবে, আমাদের জানা নেই।’

ব্যবসায়ী মোশারফ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঝড়-বৃষ্টি যাই হোক, আমাদের অফিসের উদ্দেশ্যে বের হতে হয়। বাসার নিচে পানি, অফিসের নিচে পানি। অন্যদিকে ভাড়া কয়েক গুণ। এত উন্নয়ন করে কী লাভ, যদি কোমরসমান পানি রাস্তায় থাকে?’

রোববার রাত থেকে শুরু হওয়া অবিরাম বৃষ্টিতে সোমবার সকাল থেকেই অনেকটা থমকে যায় চট্টগ্রাম নগরীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। ভারী বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন সড়কে যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বিশেষ করে অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ ছিল বেশি।

রাহাত্তারপুল এলাকার বাসিন্দা খাদিজা জান্নাত সুজন বলেন, ‘রাত থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। সকালে বের হয়ে দেখি রাস্তায় পানি আরও বেড়েছে। হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। প্রতি বছর বর্ষায় একই ভোগান্তি হলেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।’

বাকলিয়ার বাসিন্দা ফকরুল আলম বলেন, সকালে অফিসে যাওয়ার সময় রাস্তায় অনেক পানি দেখতে পেয়েছেন। পানি ও যানবাহনের সংকটের কারণে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে বলেও জানান তিনি।

বহদ্দারহাট এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী এস এম গিয়াস উদ্দিন বলেন, সড়কে পানি জমে থাকায় স্বাভাবিকভাবে হাঁটাও কঠিন হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন শিক্ষার্থীরা।

এদিকে চলমান গ্যাস সংকটের প্রভাবও পড়েছে নগরীর গণপরিবহন ব্যবস্থায়। গ্যাসের অভাবে অনেক সিএনজিচালিত অটোরিকশা সড়কে না নামায় জলাবদ্ধতার সঙ্গে যানবাহন সংকটও যুক্ত হয়েছে। ফলে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে নগরবাসীর।

জলাবদ্ধতার প্রভাব থেকে রেহাই পায়নি আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভারও। সেখানে পানি জমে উপর থেকে নিচে ঝরনার মতো পানি পড়তে দেখা গেছে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা মো. ইসমাইল ভূঁইয়া জানান, সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় হয়েছে ৮১ মিলিমিটার বৃষ্টি। লঘুচাপের প্রভাব ও মৌসুমি বায়ুর কারণে চট্টগ্রামে আরও দুই থেকে তিন দিন বৃষ্টিপাত হতে পারে বলেও জানান তিনি।

নগরীর বাইরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলাতেও ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বোয়ালখালীর চরখিজিরপুর-সাতগড়িয়াপাড়া এলাকায় পুরো বর্ষাজুড়েই জলাবদ্ধতায় চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সড়কে পানি জমে থাকায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদের চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে।

নগরবাসীর অভিযোগ, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই একই চিত্র দেখা যায়। রাতভর বৃষ্টির পর এবারও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তাদের দাবি, শুধু সাময়িকভাবে পানি সরিয়ে নেওয়া নয়, জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।