সারা দেশে চলছে বিদ্যুৎ সংকট। সরবরাহের ঘাটতি সামাল দিতে চলছে লোডশেডিং, পাশাপাশি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নেয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ। এমন পরিস্থিতিতে গোপালগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র লঞ্চঘাট এলাকায় দিনের আলোতেও জ্বলতে দেখা গেছে ৭১ ফুট উচ্চতার ওয়াচ টাওয়ারের সবকটি বাতি। রাতের আলোকসজ্জার জন্য স্থাপন করা এসব বাতি দিনের আলোয়ও জ্বলতে থাকায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব ও নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
আজ সোমবার (২৪ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে লঞ্চঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সূর্যের আলোয় চারপাশ স্পষ্ট হলেও ওয়াচ টাওয়ারের বাতি তখনও জ্বলছে। দিনের আলোয় এসব বাতি বন্ধ থাকার কথা থাকলেও তা না হওয়ায় বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
গোপালগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম রকিবুল ইসলাম বলেন, ওয়াচ টাওয়ারের বাতিগুলো সফটওয়্যারের মাধ্যমে টাইমার দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। সূর্যের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই বাতি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। তবে কেন বাতি বন্ধ হচ্ছে না, সফটওয়্যারে কোনো সমস্যা হয়েছে কি না, তা তিনি খতিয়ে দেখবেন।
২০২৫ সালের ২৬ মার্চ উদ্বোধন করা হয় গোপালগঞ্জ শহরের লঞ্চঘাট এলাকায় ৭১ ফুট উচ্চতার এই ওয়াচ টাওয়ারটি। নির্মাণে ব্যয় হয় প্রায় ১০ লাখ টাকা।
টাওয়ারটির চারপাশে রয়েছে ১০টি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বাতি। রাতের বেলায় আশপাশের এলাকা আলোকিত করার পাশাপাশি শহরের সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্দেশ্যে এসব বাতি স্থাপন করা হয়। ভবিষ্যতে ওয়াচ টাওয়ারটি নজরদারির কাজেও ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল।
তবে দিনের আলোয়ও এসব বাতি জ্বলে থাকার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে স্থাপনাটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে। স্থানীয়দের ভাষ্য, স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতি বন্ধ হওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও সেটি ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। প্রযুক্তিগত ত্রুটি হতেই পারে, কিন্তু সেই ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করে সমাধান করার বিষয়টিও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
লঞ্চঘাট এলাকার বাসিন্দা নূর ইসলাম বলেন, রাতে এই বাতি জ্বলায় আমাদের উপকার হচ্ছে ঠিকই কিন্তু দিনের আলোয় এতগুলো বাতি জ্বলতে থাকা অপ্রয়োজনীয়। সকালে বাতি বন্ধ হওয়ার কথা থাকলে সেটি ঠিকমতো হচ্ছে কি না, কর্তৃপক্ষের তা দেখা উচিত।
স্থানীয় ব্যবসায়ী সাগর আহমেদ বলেন, বিদ্যুৎ সংকট শুধু গোপালগঞ্জে নয়, সারা দেশের মানুষই এর ভোগান্তিতে আছে। এমন সময়ে দিনের বেলায় বাতি জ্বালিয়ে রাখা খুবই দুঃখজনক। সফটওয়্যার দিয়ে যদি বাতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তাহলে সেটি ঠিকমতো কাজ করছে কি না, নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা আলমগীর হোসেন বলেন, সফটওয়্যারে সমস্যা হতে পারে। কিন্তু দিনের আলোয় বাতি জ্বলছে—এটা দেখার মতো বিষয়। দায়িত্বপ্রাপ্তরা নিয়মিত নজরদারি করলে এমন ঘটনা দীর্ঘ সময় চলার কথা নয়।
স্থানীয়দের মতে, বিষয়টি শুধু বিদ্যুতের অপচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে দায়িত্বে গাফিলতির প্রশ্নও জড়িত। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। কারণ যেকোনো প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা বিকল হতে পারে। সেটি ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা এবং ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট শুধু গোপালগঞ্জের নয়, সারা দেশেই বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি ও লোডশেডিং চলছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকারও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন ছাড়া বিদ্যুতের ব্যবহার কমানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
সচেতন নাগরিকদের মতে, জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ সংকট থাকলে স্থানীয় পর্যায়েও বিদ্যুৎ ব্যবহারে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। বিশেষ করে দিনের আলোয় যখন কোনো কৃত্রিম আলোর প্রয়োজন নেই, তখন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একাধিক বাতি জ্বালিয়ে রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, সূর্যের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে বাতি বন্ধ হওয়ার কথা থাকলেও সকাল ৯টায়ও কেন তা জ্বলছিল এবং পৌরসভার দায়িত্বপ্রাপ্তদের নজরে বিষয়টি আগে কেন আসেনি?
রাতের অন্ধকার দূর করতে যে বাতি স্থাপন করা হয়েছে, দিনের আলোয় সেই বাতিই যদি অযথা জ্বলতে থাকে, তাহলে তা শুধু বিদ্যুতের অপচয় নয়—সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা ও নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
তাই স্থানীয়দের দাবি, সফটওয়্যারে ত্রুটি থাকলে তা দ্রুত মেরামতের পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন দিনের আলোয় বাতি জ্বলে না থাকে, সে বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে স্বয়ংক্রিয় সেন্সর বা আরও নির্ভরযোগ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালুরও দাবি জানিয়েছেন তারা।