জন্মাষ্টমীতে ১৫ দফা দাবি জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের
সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি
সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ ১৫ দফা দাবি জানিয়েছে শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ বাংলাদেশ। একই সঙ্গে সরকারি চাকরিতে বৈষম্য বন্ধ, দেবোত্তর সম্পত্তি সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন এবং শারদীয় দুর্গোৎসবে তিন দিনের সরকারি ছুটির দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সকালে চট্টগ্রামে পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে আগামী ৪ সেপ্টেম্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে চার দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে পরিষদের নেতারা বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে হিন্দু সম্প্রদায় সাম্প্রদায়িক হামলা, নির্যাতন, শোষণ ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে। এসব ঘটনার যথাযথ বিচার না হওয়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে হতাশা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সাম্প্রদায়িক হামলা, জমি ও শ্মশান দখল, মিথ্যা মামলা এবং ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হয়রানির অভিযোগেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা।
বক্তারা বলেন, দেশের সব ধর্মের মানুষের সমঅধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কোনো নাগরিক যেন ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হয়রানি, বৈষম্য কিংবা নির্যাতনের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবিও জানান তারা।
১৫ দফা দাবি
পরিষদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—সংবিধানের আলোকে হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জাতিগত সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, বৈষম্যমূলক আইন বিলুপ্ত এবং হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন।
এছাড়া সরকারি চাকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে হিন্দুদের অধিকার নিশ্চিত ও পদায়নে বৈষম্য বন্ধ, পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন, সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন এবং দেবোত্তর সম্পত্তি সংরক্ষণ আইন প্রণয়নের দাবি জানানো হয়।
ধর্মীয় সভার নামে অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনাকারীদের আইনের আওতায় আনা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সাইবার আইনে দায়ের করা হিন্দুদের মামলাগুলো প্রত্যাহারের দাবিও রয়েছে।
আরও রয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবে তিন দিনের সরকারি ছুটি, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকে হিন্দু ফাউন্ডেশনে রূপান্তর, সাম্প্রদায়িক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি, মন্দির ও প্রতিষ্ঠান সরকারি অর্থায়নে পুনর্নির্মাণ, সংসদে হিন্দুসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর জন্য সংখ্যানুপাতিক আসন সংরক্ষণ এবং দেশের প্রতিটি জেলায় মডেল মন্দির নির্মাণের দাবি।
সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে সনাতনী স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
৪ সেপ্টেম্বর মহাশোভাযাত্রা
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আগামী ৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় চট্টগ্রামে মহাশোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। আন্দরকিল্লা মোড় থেকে শুরু হয়ে টেরিবাজার, লালদিঘি মোড়, কোতোয়ালি মোড়, নিউ মার্কেট মোড়, আমতল, রাইফেলস ক্লাব, বোস ব্রাদার্স, ডিসি হিল, বৌদ্ধ বিহার, চেরাগী ও মোমিন রোড হয়ে শোভাযাত্রাটি জেএমসেন হলে গিয়ে শেষ হবে।
মহাশোভাযাত্রায় মাঙ্গলিক উদ্বোধক হিসেবে থাকবেন বাঁশখালী ঋষিধামের মোহন্ত মহারাজ স্বামী সচিদানন্দ পুরী মহারাজ। প্রধান অতিথি হিসেবে থাকার কথা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর। উদ্বোধক হিসেবে থাকবেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এমপি।
এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট চন্দন তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক লায়ন আর.কে দাশ রুপু, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ট্রাস্টি দীপক কুমার পালিত, কার্যকরী সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব দে পার্থ এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের সাংগঠনিক সম্পাদক রাজীব ধর তমাল।
মহাশোভাযাত্রা উপ-কমিটির আহ্বায়ক বাবুল ঘোষ বাবুনের সভাপতিত্বে কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। সঞ্চালনা করবেন উপ-কমিটির সদস্য সচিব শিমুল মুহুরী।
মাতৃ ও ধর্ম সম্মেলন
এদিন দুপুর ১টায় অনুষ্ঠিত হবে মাতৃ সম্মেলন। উদ্বোধক থাকবেন শ্রীশ্রী বৈকুণ্ঠ ধামের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ শ্রীমৎ স্বামী স্বরূপানন্দ শাস্ত্রী মহারাজ। প্রধান অতিথি থাকবেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক প্রফেসর ওদিতি দত্ত। সভাপতিত্ব করবেন মাতৃ উপ-পরিষদের আহ্বায়ক দিপ্তী দাশ।
বিকেল ৫টায় অনুষ্ঠিত হবে ধর্ম সম্মেলন। এতে উদ্বোধক হিসেবে থাকবেন কৈবল্যধামের মোহন্ত মহারাজ শ্রীমৎ কালীপদ ভট্টাচার্য্য। মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বালন করবেন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, চট্টগ্রামের অধ্যক্ষ স্বামী শক্তিনাথানন্দজী।
ধর্ম সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম এবং ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনের সহকারী হাইকমিশনার হরিশ কুমার।
প্রধান বক্তা হিসেবে থাকবেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান। সংবর্ধিত অতিথি হিসেবে থাকবেন চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মাহবুবের রহমান শামীম।
ধর্ম সম্মেলনে সভাপতিত্ব করবেন শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট চন্দন তালুকদার। স্বাগত বক্তব্য দেবেন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক লায়ন আর.কে দাশ রুপু।
পরিষদের নেতারা বলেন, শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ বাংলাদেশ গত ৪৩ বছর ধরে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে জন্মাষ্টমী উৎসব পালন করে আসছে। ধর্মীয় সম্প্রীতি, মানবিকতা, স্বদেশপ্রেম ও পারস্পরিক সহিষ্ণুতার মধ্য দিয়ে একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে তারা কাজ করে যেতে চান। এজন্য সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতাও কামনা করেন তারা।