শিক্ষাই উপকূলীয় জেলে সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিকেলে নগরের ইপিজেড থানাধীন দক্ষিণ হালিশহরের আকমল আলী ঘাট বেড়িবাঁধ এলাকায় স্বপ্নীল মডেল একাডেমি আয়োজিত মানবিক সহায়তা ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, ৫০ বছর আগে যেভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জেলেরা সাগরে মাছ ধরতে যেতেন, আজও যদি একই পদ্ধতিতে তাঁদের মাছ ধরতে যেতে হয়, তবে সেই ব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরি। আর এ পরিবর্তনের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো শিক্ষা।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়ন হলেও জেলে ও চা-শ্রমিক সম্প্রদায়ের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। এ ক্ষেত্রে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকেও নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে এগিয়ে আসতে হবে।
জেলে পরিবারের অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সন্তানদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠাতে হবে। শুধু বই, খাতা বা পোশাক দিলেই দায়িত্ব শেষ হবে না; শিক্ষার মাধ্যমে তাদের আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
তিনি বলেন, “আপনাদের সন্তানরা যেন আগের মতো ঝুঁকি নিয়ে সাগরে না যায়। তারা যেন শিক্ষা, জ্ঞান, দক্ষতা ও প্রযুক্তি নিয়ে মাছ আহরণে যায়। বাবা-মা হিসেবে কিছু কষ্ট স্বীকার করতে হবে। নিজের ও সন্তানের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য এই কষ্ট প্রয়োজন।”
জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষ। শিক্ষা, দক্ষতা ও প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষকে সম্পৃক্ত করা গেলে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। একজন মৎস্যজীবীকেও দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তিনি নিজের পেশার পাশাপাশি দেশের উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে পারেন।
জেলেদের নিরাপত্তায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান
সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন জেলা প্রশাসক।
তিনি বলেন, “একজন জেলে সাগরে গেলে প্রযুক্তির মাধ্যমে তাঁর অবস্থান শনাক্ত করা এবং পরিবারের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তা জানা সম্ভব হওয়া উচিত। আমরা চাই না, একজন জেলে ভাই সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ থাকবেন, অথচ তাঁর অবস্থান কেউ জানতে পারবে না।”
তিনি জানান, মৎস্যজীবী ও চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে তিনি জেলেদের উদ্দেশে বলেন, নিজেদের প্রয়োজন ও সমস্যার কথা প্রশাসনকে জানাতে হবে।
বিদ্যালয়ের জন্য সরকারি সহায়তার আশ্বাস
উপকূলীয় জেলে পরিবারের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে নবপ্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির বিদ্যুৎ সংযোগসহ প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তার আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক।
তিনি বলেন, গত শীতে শীতবস্ত্র বিতরণের সময় স্থানীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে স্কুল, বই ও পোশাক দেওয়ার পরও যদি সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানো না হয়, তাহলে এ উদ্যোগ সফল হবে না।
সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) পাঠান মো. সাইদুজ্জামান বলেন, জেলা প্রশাসক সবসময় মৎস্যজীবী ও চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার এত বছর পরও এই জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশিত উন্নয়ন হয়নি। সরকার, প্রশাসন ও সমাজের সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
খাদ্য সহায়তা ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ
অনুষ্ঠানে সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ৪০০ জেলে পরিবারের মধ্যে খাদ্য ও উপহারসামগ্রী বিতরণ করা হয়। প্রতিটি প্যাকেটে চাল, ডাল, তেল, লবণ, চিনি, নুডলস, চিড়া, বিস্কুট, সাবান, মোমবাতি, লাইটার ও ওরস্যালাইন ছিল।
এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত একটি প্রতিষ্ঠানের পুনর্বাসনের জন্য ১২ বান্ডিল ঢেউটিন ও ৩৬ হাজার টাকার চেক প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে ১১৮ জন শিক্ষার্থীর হাতে নতুন স্কুল ড্রেস ও দুটি করে খাতা তুলে দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের সমস্যার কথা শুনলেন জেলা প্রশাসক
পতেঙ্গা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফারিস্তা করিম জানান, জেলা প্রশাসকের উদ্যোগেই স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের বিদ্যালয়ের দাবি বাস্তবায়নের পথে এগিয়েছে। তিনি বলেন, এলাকায় প্রায় ৬৫০ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। পাশাপাশি নৌযান চলাচলের রুট ও নেভিগেশন চ্যানেলে জাল না বসানোর আহ্বান জানান এবং স্থানীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নলকূপ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান।
উত্তর চট্টলা জেলে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হরি জলদাস অভিযোগ করেন, বিভিন্ন এলাকার জেলেরা জাল কেড়ে নেওয়া, মাছ ধরায় বাধা এবং নানা ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তিনি এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধানে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন।
অনুষ্ঠান শেষে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা পায়ে হেঁটে স্থানীয় জেলে পল্লী পরিদর্শন করেন। তিনি জেলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের আবাসন, শিক্ষা, সুপেয় পানি, নিরাপত্তা ও জীবিকার নানা সমস্যা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।
এ সময় তিনি স্থানীয়দের আশ্বস্ত করে বলেন, বাস্তব সমস্যাগুলো প্রশাসনের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে, যাতে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা, ব্রাইট ফাউন্ডেশন-এর কর্মকর্তারা, মৎস্যজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।