বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থীদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশে প্রতীক বরাদ্দ করা হয়েছে। শুক্রবার (২৬ মে ) সকালে বরিশাল আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়।
সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির জানান, প্রথমে মেয়র প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরপর নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের সাধারণ ও ১০টি আসনের সরক্ষিত কাউন্সিলরদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়।
প্রতীক বরাদ্দের পর পরই প্রার্থীরা প্রচার প্রচারণায় আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে নেমেছেন। প্রার্থীদের পক্ষে ইজিবাইকযোগে শুরু হয়েছে মাইকিং।
মেয়র প্রার্থীরা প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার পরপরই কাউন্সিলর প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দ করা হয়। তবে কাউন্সিলর পদে একই প্রতীক একাধিক প্রার্থী দাবি করায় লটারীর মাধ্যমে প্রতীক বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রতীক পাওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ও তাদের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি এবং কর্মী সমর্থকরা নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে নেমেছেন।
গাজীপুর সিটি নির্বাচনের মতোই বরিশালের নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার দাবি তুলে প্রার্থীরা দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। আগামী ১২ জুন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এবার মেয়র পদে সাতজন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১১৬ এবং সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৪২ জন প্রার্থীর মাঝে প্রতীক বরাদ্দ করা হয়েছে।
নৌকা প্রতীক পেয়ে নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার মার্কার মেয়র প্রার্থী খোকন সেরনিয়াবাত সাংবাদিকদের বলেন, নগরবাসী তাদের মূল্যবান ভোটের মাধ্যমে আমাকে মেয়র হিসেবে নির্বাচিত করলে ভোটারদের সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া হবে। সিটি করপোরেশন হবে সবার জন্য উন্মুক্ত। অপর মেয়র প্রার্থী লাঙল মার্কার ইকবাল হোসেন তাপস বলেন, ইভিএমে ভোট নিয়ে অনেক ঝামেলা দেখা যাচ্ছে। সে কারণে ব্যালটে ভোটগ্রহণ চাচ্ছি আমরা।
হাতি মার্কার স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, কোনো সন্ত্রাসী এই বরিশাল শহরে ঠাঁই পাবেনা, তবে নির্বাচন নিয়ে আমরা শঙ্কিত। তিনি আরও বলেন, ইভিএমে ভোটগ্রহণ চাচ্ছি না। কারন গাজীপুরে ইভিএমে ভোটগ্রহণ দেখেছি। গভীর রাত করে যদি ফলাফল ঘোষণা করতে হয়, তাহলে ইভিএমের সুফলটা কী?
রিটার্নিং কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতীক পাওয়ার পর প্রার্থীরা এখন নির্বাচনী বিধি-নিষেধ মেনে প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারবেন। বেলা দুইটার পর থেকে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারনা ও মাইকিংয়ের শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে বরিশাল নগরীর নির্বাচনী পরিবেশ। পাশাপাশি ছাপাখানা গুলোতে চলছে লিফলেট ও পোস্টার ছাপনোর হিড়িক। ফলে ব্যস্ত সময় পার করা ছাপাখানার কর্মীরা জানিয়েছেন, পোস্টার ও লিফলেট ছাপানো কেন্দ্রীক আমাদের ব্যস্ততা বেড়েছে। বৃষ্টির মৌসুম হওয়ায় অনেক প্রার্থী লেমিনেশন করা পোস্টার ছাপাচ্ছেন। যাতে বৃষ্টিতে তাদের পোস্টার নষ্ট না হয়।
অপরদিকে প্রতীক বরাদ্দ পেয়ে প্রচারনায় নেমে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে সরকার ও ইসির প্রশংসা করে জাপা মনোনীত লাঙল মার্কার প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস বলেন, গাজীপুরের ন্যায় যেন বরিশালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তাহলে জনগন যাকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন, আমরা তাকেই সাদরে মেনে নিবো। হাতপাখার প্রার্থী মুফতী সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম বলেন, গাজীপুরে যেকারণে ইভিএমএ ধীরগতি দেখা গেছে, বরিশালের নির্বাচনে যেন তা আগে থেকেই সংশোধন করে রাখা হয়। উল্লেখ্য, আগামী ১২ জুনের নির্বাচনে নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের ১২৬টি ভোট কেন্দ্রে মোট ২ লাখ ৭৬ হাজার ২৯৮ জন ভোটার বেঁছে নেবেন তাদের পছন্দের প্রার্থীদের।
নৌকার প্রার্থী খোকন সেরনিয়াবাত বলেছেন, সারাদেশে প্রধানমন্ত্রীর যে উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ চলছে তা থেকে বরিশাল নগরবাসী বঞ্চিত। নগরবাসী নানা বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। এখানকার মানুষের রয়েছে ট্যাক্সের বিড়ম্বনা। এখানে রাস্তাঘাটের যে অবস্থা, তেমনি রয়েছে পানি সরবরাহে সংকট। এসব সংকট থেকে বরিশালবাসীকে মুক্ত করা হবে। তাই আগামী ১২ জুন নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আমাকে মেয়র নির্বাচিত করে নগরবাসী সেই সুযোগ সৃষ্টি করে দিবেন বলে শতভাগ বিশ্বাস করছি। প্রতীক বরাদ্দের পর আনুষ্ঠানিক প্রচারনায় নেমে এসব কথা বলেছেন, নৌকার প্রার্থী খোকন সেরনিয়াবাত।
অন্যদিকে বরিশাল সিটি নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট বলরাম পোদ্দার বলেন, গাজীপুরের নির্বাচনে সদ্য আওয়ামী লীগ থেকে বহিঃস্কৃত সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মা জায়েদা খাতুন ছিলেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী। তাই সেখানে দলীয় ভোট ভাগ হয়েছে। কিন্তু বরিশালে আওয়ামী লীগ ঘরোয়ানা কোন বিদ্রোহী প্রার্থী নেই, তাই ভোট ভাগ হওয়ারও কোন সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই, সাবেক সফল মন্ত্রী শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের ছেলে, সাবেক চীফ হুইপ বর্তমানে মন্ত্রী পদমর্যাদায় থাকা বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এমপি’র একমাত্র ছোট ভাই।
জাতীয় পার্টি মনোনীত লাঙল মার্কার মেয়র প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস বলেছেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তীতে আমাদের শপথ নিতে হবে-জাতীয় কবি অন্যায়, অত্যাচার, অনিয়মের বিরুদ্ধে যেভাবে লড়াই করেছেন, কারাবরণ করেছেন কিন্তু আপোষ করেননি। তিনি ছিলেন বিদ্রোহ কবি। তার বিদ্রোহ আজ সমাজে ছড়িয়ে দিতে হবে। বর্তমান সমাজের দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নির্মূল করতে নজরুলের চেতনা ধারণ করতে হবে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত হাতপাখা মার্কার মেয়র প্রার্থী মুফতী সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম প্রতীক বরাদ্দের পর প্রচারনা নেমে বলেছেন, বরিশাল নগরীতে ময়লা আবর্জনার অব্যবস্থাপনার কারণে বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে আশেপাশের পরিবেশ দূষণ ছড়াচ্ছে। এতে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে। আমি বিজয়ী হলে ময়লা ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণরোধ করার কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
মেয়র প্রার্থীরা যে প্রতীক পেলেন:
এবার সাতজন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে দলীয় নৌকা প্রতীক বরাদ্দ পেয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত, লাঙল প্রতীক বরাদ্দ পেয়েছেন জাতীয় পার্টির ইঞ্জিনিয়ার ইকবাল হোসেন তাপস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী মুফতী সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম হাতপাখা প্রতীক বরাদ্দ পেয়েছেন, জাকের পার্টি মনোনীত আলহাজ মো. মিজানুর রহমান বাচ্চু গোলাপ ফুল প্রতীক বরাদ্দ পেয়েছেন।
এছাড়া বিএনপি ঘরোয়ানা স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী সাবেক ছাত্রদল নেতা কামরুল আহসান রুপণ প্রতীক হিসেবে ‘টেবিল ঘড়ি’ পেয়েছেন। সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সাবেক মৎস্যজীবী বিষয়ক সম্পাদক প্রয়াত আহসান হাবিব কামালের ছেলে রুপণ। অপর দুই স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থীর মধ্যে মো. আলী হোসেন হাওলাদার (হরিন) এবং সাংবাদিক মো. আসাদুজ্জামান আসাদ (হাতি) প্রতীক পেয়েছেন। প্রতীক বরাদ্দের পর সব প্রার্থী এবারের নির্বাচনে বিজয়ের প্রত্যাশা করছেন। ভোটের লড়াইয়ে জয়ী হলে বরিশালের উন্নয়নসহ নানা কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথাও বলেন প্রার্থীরা।
কাউন্সিলর প্রার্থী বিএনপির ১৮ নেতা
সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষদিনে দলের হুঁশিয়ারি থাকা সত্বেও বিএনপির ১৮ নেতা তাদের প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেননি। তারা কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। প্রতীক বরাদ্দের পর তারাও স্ব স্ব ওয়ার্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারনায় নেমেছেন। মহানগর বিএনপির নেতৃবৃন্দরা জানিয়েছেন, দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এসব নেতাদের তালিকা কেন্দ্রে পাঠানো হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন দলের মোট ২১ জন তাদের প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ফলে বরিশালে এখন মেয়র প্রার্থী সাতজন, সাধারণ কাউন্সিলর ১১৬ জন এবং সংরক্ষিত কাউন্সিলর ৪২ জনে ভোটের লড়াই করার জন্য মাঠে রয়েছেন। এরমধ্যে সাধারণ ও সংরক্ষিত মিলিয়ে এখন বিএনপির ১৮ নেতা কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্ধীতা করছেন।
এদিকে আগামী ১২ জুন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোট সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে দ্বিতীয় পর্যায়ে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) তিনদিনের কারিগরি প্রশিক্ষণ বৃহস্পতিবার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার সম্মেলন কক্ষে শেষ হয়েছে। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. ওয়াহিদুজ্জামান মুন্সি জনকণ্ঠকে বলেন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ৫০ জন অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রথমপর্যায়ে ৮৫ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল জেলা নির্বাচন কমিশন। সবমিলিয়ে ১৩৬ জন প্রশিক্ষণার্থীকে ১২ জুনের নির্বাচনে প্রত্যেকটি কেন্দ্রে ইভিএম সুরক্ষায় ও পোলিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।