জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রতিবার একটা রাজনৈতিক সংলাপের আয়োজন দেখা যায়। ফলাফল যাই হোক না কেন দুই বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা সংলাপ করেন। দেশবাসি তা উপভোগও করেন। নব্বইয়ের পর থেকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যেই এ সংলাপ চলে আসছে। যদিও এক একবার এক এক ফর্মে এই সংলাপ হয়েছে।
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়েও বিরোধীদের দাবির সুরাহা করতে বরাবরের মতো বিদেশিরা দূতিয়ালি করেই যাচ্ছে। কিন্তু সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় আলোর রেখা মিলছে না। কিভাবে আসবে দুই পক্ষের মুখোমুখি সংলাপের দিন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার অন্ত নেই।
বিএনপি তাদের ১০ দফা দাবি নিয়ে মিত্রজোটদের সাথে রাজপথে আন্দোলনে রয়েছে। তাদের প্রধান দাবি সরকারের পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলছে বিগত দুটো নির্বাচন সংবিধান মতে, বর্তমান সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনও তাই হবে। দুই পক্ষের দুই অবস্থান থেকে কেউ সরে আসছে না । তাহলে মীমাংসার পথ কী? বিদেশি কূটনৈতিকরাও দুই দলের সাথে বারবার বৈঠক করে দুই পক্ষকে এক কথাতে আনতে পারছেন না। কিন্তু আড়ালে আলাপে দুই দলের আগ্রহও দেখা যাচ্ছে।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর একজন সদস্য বলেন, ‘সংলাপ তো চলছে। মিডিয়ার টক শোতে, মাঠে মঞ্চে। এক দল আরেক দলকে উদ্দেশ্য করে যে বক্তব্য দিচ্ছে, তাও এক ধরনের সংলাপ। এসব অনেকেই সংলাপ বলে টের না পেলেও ম‚লত এটাও এক ধরনের সংলাপ।’
গতকাল রবিবার একটি বেসরকারি টিভি চ্যালেনের টক শোতে দেখা গেছে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা নাজমা রহমান বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সদস্যকে উদ্দেশ্যে করে বলেন, আপনারা আন্দোলন করে সরকারের পদত্যাগে বাধ্য করার করা কথা বলছেন, আপনাদের সাথে জনগণ তো নেই। আপনারা যেদিন সমাবেশ করেন হাজার হাজার মানুষ জড়ো করে, আওয়ামী লীগও একই দিনে আপনাদের চেয়ে বেশি মানুষকে নিয়ে সমাবেশ করছে। জনগণ কার সাথে আছে বুঝেন। আর আন্দোলন করে আওয়ামী লীগ সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য কখনো করতে পারবেন না, অতীতেও পারেননি। বরং আওয়ামী লীগ আন্দোলন করে ৯৬তে বিএনপি সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল।
সম্প্রতি আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা যেতে পারে। বিএনপি যদি রাজি থাকে। কিন্তু তাদেরকে ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় নির্বাচনকালীন সরকারে মন্ত্রণালয় দেয়ার কথা বলেলও তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্যের পর পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ত্রিদেশিয় সফর নিয়ে আয়োজিত সংলাপে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন,সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো ইচ্ছে করলে নির্বাচনকালীন সরকারে অংশ নিতে পারেন। তিনি তখন বলেন, বিএনপি তো সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছে। তাদের তো থাকার সুযোগ নেই। তাদেরকে আহবান জানাতে হবে কেন ?
এদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর রবিবার (২১ মে ) জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সভায় বলেছেন, এ সরকারের আমলে কোন নির্বাচনে মানুষের অংশগ্রহণ নেই। সিটির কোন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী নেই। বিএনপিবিহীন নির্বাচনে মানুষের আগ্রহ নেই। অংশগ্রহণ মূলক নির্বাচন দেখতে চায় দেশের মানুষ। বিদেশিরাও সেই কথা বলছেন।
সংলাপ বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেছে, বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বড় একটি অংশ বয়স্ক। তাদের অনেকের এবারের পরে নির্বাচন করার সক্ষমতা আর থাকবে না। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকতে গিয়ে তাদের সামাজিক মর্যাদা নষ্ট হয়েছে। এ সময় সংসদ সদস্য হয়ে মর্যাদা নিয়ে চলতে চান তারা। বিএনপির ওই অংশের সঙ্গে তৃণম‚ল পর্যায়ের অনেক নেতাও রয়েছেন যারা নির্বাচনে যেতে চান। ফলে নির্বাচনে যেতে আগ্রহী বিএনপির সেই সব নেতা আড়ালে আবডালে সংলাপে রাজি হতে পারেন।
অন্যদিকে আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক দেখতে চাওয়া বিদেশি শক্তিগুলোর সরকারের ওপর চাপ থাকায় বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে চায় আওয়ামী লীগ। ফলে কোন না কোন ফর্মে সংলাপের দরজা খুলে যেতে পারে বলে রাজনৈতিক অভিজ্ঞমহল মনে করছেন। তারা এমনও বলেছে, দুই দলের শীর্ষ পর্যায়ের দুই নেতা হঠাৎ করে ফোন করে একে অপরকে চায়ের দাওয়াত দিতে পারে। তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সংবিধানের বাইরে এক চুলও নড়বে না। অন্যদিকে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে কোনোভাবেই দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে যাবে না। দুই দলই নিজেদের এমন অনড় অবস্থান দেখাচ্ছে। দুই দলের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের ফলে সৃষ্ট সংকট সমাধানে বিদেশি তৎপরতা বেশ আগে থেকেই শুরু হয়েছে। নির্বাচন যতই এগিয়ে আসতে শুরু করেছে বিদেশি সেই তৎপরতায়ও গতি এসেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ-বিএনপি কাউকেই কাছাকাছি অবস্থানে, অর্থাৎ এক মেরুতে আনতে পারেনি এখনো। তবে বিদেশি প্রভাবশালী দেশগুলোর প্রতিনিধিরা সংকট নিরসনে দুই দলকেই সংলাপে বসার জন্য বলছেন।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ দুইজন নেতা বলেন, বিভিন্ন দেশের ক‚টনীতিকেরা সংলাপের মধ্য দিয়ে সমস্যা সমাধানের রাস্তা ঠিক করতে দুই দলকেই তাগিদ দিয়েছেন। বিদেশিদের অবস্থান হলো আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণম‚লক দেখতে চান তারা। সে জন্য রাস্তা তৈরি করতে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপিকে পরামর্শ দিয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলই সংলাপে অনীহা দেখিয়ে আসছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ্যে অনীহার কথা জানিয়েছেন। বিএনপিও প্রায় প্রতিদিনই অনীহা প্রকাশ করে বক্তব্য রাখছে।
তবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা এমনও বলেন, এর আগেও সংলাপে সমাধান আসেনি। এবারও সংলাপে সমাধান আসার সম্ভাবনা কম। যদি সংলাপের আগেই এজেন্ডা নির্ধারণ করে সংলাপে বসে, সেই সংলাপ সফল হওয়ার পথ থাকে না।
নির্বাচন সামনে রেখে দেশে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ কয়েকটি দেশের কূটনীতিকেরা সংকট নিরসনে এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। ওই সব বৈঠকে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে দুই দলেরই অবস্থান জানতে চেয়েছেন তারা।
একই সঙ্গে দুই দলকে তারা এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন যে ভিন্নমত থাকলেও স্থিতিশীলতা ও সুশাসনের স্বার্থে আগামী সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণম‚লক, সুষ্ঠু ও অবাধ হওয়া জরুরি। এ কারণে নির্বাচনের আগে দুই প্রধান দলের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার আবশ্যকতা রয়েছে। এই সমঝোতার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ, কিংবা উভয় পন্থায় দুই দলের মধ্যে ‘আলাপ’ হওয়া দরকার, তা সেটা সংলাপ বা আলোচনা যে নামেই করা হোক না কেন।
এদিকে ক‚টনীতিকদের কাছে আওয়ামী লীগ অভিযোগ করেছে, বিএনপি কোনো ধরনের সংলাপে আগ্রহী নয়। ২০১৪ সালের নির্বাচন কেন্দ্র করে বিএনপির আচরণ বিদেশিদের কাছে তুলে ধরে সংলাপে বিএনপির অনীহার কথা জানান।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ বলেন, ‘যেকোনো সমস্যার সমাধান সংলাপের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব। সংলাপে বসলে হয়তো শতভাগ পাব না। তবে গিভ অ্যান্ড টেক তো কিছু হবেই। গণতন্ত্রে সংলাপের কোনো বিকল্প নেই।’
সর্বশেষ ১৮ মে গুলশানের আমেরিকান ক্লাবে মার্কিন দূতাবাসের পলিটিক্যাল চিফ ব্রান্ডন স্ক্যাট, পলিটিক্যাল অফিসার ম্যাথিউ বে, পলিটিক্যাল কনস্যুলার ডেনিয়েল শেরির সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ।
জানতে চাইলে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘ক‚টনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকগুলোতে তারা আমাদের অবস্থান জানতে চান। আমরাও আমাদের অবস্থান তুলে ধরি। সর্বশেষ তারা জানতে চেয়েছেন, নিরপেক্ষ নির্বাচন না হলে আপনাদের অবস্থান কী। আমরা বলেছি, আন্দোলন চলছে, সেটা আমরা কন্টিনিউ করব। তারা অন্য পক্ষের (ক্ষমতাসীনদের) কথাও শুনছেন।
এ অবস্থায় তারা কী করছে (দূতিয়ালি), নাকি অন্য কিছু হচ্ছে সেটা তাদের বিষয়। তবে আমরা মনে করি, গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে আরেকটি গণতান্ত্রিক দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসুক, মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত হোক, সে ব্যাপারে তাদের চেষ্টা অব্যাহত থাকুক।’