দরজা খুলছে না, কাদেরের মিষ্টি কথায় ফখরুল ভুলছেন না

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে মুখ খুলতে শুরু করেছে সরকার ও বিরোধী পক্ষ। তবে তা ধীরে ধীরে। বন্ধ দরজায় কড়া নাড়া পড়ছে। সরকার এতোদিন অনড় অবস্থানে থাকলেও তা থেকে যেনো একটু সরে আসছে। তা হলো ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের পরশুদিন আচমকা একটা প্রস্তাব দিয়ে বসেন বিএনপির উদ্দেশ্যে। তা হলো নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপিকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হবে। তবে শর্তসাপেক্ষে। আবার সেই শর্ত মানতে রাজি না বিএনপি। তবে কেউ কেউ বলছেন বরফ গলতে শুরু করেছে। এখানে এখন একজন মধ্যস্থতাকারির প্রয়োজন। দুই পক্ষকে এক জায়গায় বসানোর দায়িত্বশীল মহলটি কে বা কারা হবেন।

অতীতে বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন রাজনৈতিক সংকট নিরসনে জাতিসংঘ বারবার উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরেও জাতিসংঘের বিশেষ ভূমিকা প্রত্যাশা করে বিএনপি। দলটির নেতারা ঘরোয়া বিভিন্ন আলোচনায় এমন প্রত্যাশার কথা বললেও এবার ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক গোয়েন লুইসের সঙ্গে বৈঠকে এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। গত সোমবার দুপুের রাজধানীর গুলশানে সমন্বয়কের বাসভবনে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে বিএনপির তিন নেতা দেশের সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন বলে জানা গেছে।

বৈঠক সূত্র জানায়, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অবস্থান জানতে চান জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক গোয়েন লুইস। জবাবে বিএনপি নেতারা বলেন, তারা শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাবেন না। দলের এই সিদ্ধান্তে তারা অটল রয়েছেন। নির্বাচন হতে হবে নির্দলীয় সরকারের অধীনে, এটা দেশবাসীরও চাওয়া। এ সময় ২০১৪ ও ২০১৮ সালে শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত দুটি সংসদ নির্বাচনের উদাহরণ টেনে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্দলীয় তত্ত্াবধায়ক সরকারের পক্ষে বিএনপি তাদের যুক্তি তুলে ধরে। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে কী হয় সে সম্পর্কে জাতিসংঘ সমন্বয়ক বিএনপির কাছ থেকে ধারণা পেয়েছেন বলে বৈঠকে উপস্থিত নেতারা জানান। বৈঠকে বিএনপি নেতারা বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচন নিয়ে জাতিসংঘের অতীতের ভূমিকার প্রশংসা করেন।

এদিকে ওবায়দুল কাদেরের প্রস্তাবনা প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরাসরি প্রস্তাবনাকে নাকচ করে দিয়ে বলেন,সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। রাজপথে জনগণ যেভাবে জেগে উঠছে সরকার পদত্যাগে বাধ্য হবেন। সরকার নিজেকে বাঁচাতে এখন আবোল তাবোল বলছে। বিএনপি সরকারের সাথে কোন আলোচনায় যাবে না।

প্রসঙ্গত,গত রোববার সেতু কর্তৃপক্ষের এক সভা শেষে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিএনপি আগামী নির্বাচনে আসার ঘোষণা দিলে তাদের নির্বাচনকালীন সরকারে রাখার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে আওয়ামী লীগ।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপিকে নির্বাচনমুখী করতে এটি ক্ষমতাসীন দলের একটি কৌশলমাত্র। এমন প্রস্তাবের মাধ্যমে বড় দুই রাজনৈতিক দলের দূরত্ব কমবে এমন আশা করছেন না তারা।

২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয় রাজনীতির মাঠ। তখন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব দেয় আওয়ামী লীগ। ৯ বছর আগে নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে আওয়ামী লীগের দেওয়া ওই প্রস্তাব বিএনপি গ্রহণ করেনি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে নির্বাচন শেষ হয়।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান এখনো ২০১৪ সালের জায়গায় রয়ে গেছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপিসহ বিভিন্ন দল দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনে ছিল। রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারে থেকেই নির্বাচন করেছিল। সে সময়ও সংবিধানের বাইরে গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারের দাবি মানতে রাজি হয়নি আওয়ামী লীগ। সেবার বিএনপি নির্বাচন বয়কট করলেও নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি। ভোট নিয়ে বিতর্ক হলেও পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করে আওয়ামী লীগ। সর্বশেষ ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনও হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে। বিএনপি সেই নির্বাচনে অংশ নিলেও সুবিধা করতে পারেনি।

গত ৯ বছরে রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সন্দেহ, অবিশ্বাস প্রকট হয়েছে। বেড়েছে রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক দূরত্বও। এখন দুই রাজনৈতিক দলের অবস্থান দুই মেরুতে বলা যায়। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপিসহ বিভিন্ন দল নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের পুরোনো দাবিতেই আন্দোলনে রয়েছে। দাবি আদায়ে এবার দলটি চূড়ান্ত আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলছে। এমন পটভূমিতে আওয়ামী লীগ তাদের অধীনে নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপিকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় দেওয়ার সেই পুরোনো প্রস্তাব সামনে নিয়ে এসেছে। এর সঙ্গে সেই পুরোনো শর্তের কথাই বলা হচ্ছে যে বিএনপিকে আগে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিতে হবে।

গত রোববার বনানীর সেতু ভবনে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তখন একজন সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল, ‘২০১৪ সালের ভোটের আগে নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। এখন নির্বাচনের সময় বিএনপির কাউকে মন্ত্রিত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না?’
সাংবাদিকের এ প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত যদি নিতে হয়, তাহলে সংবিধানের মধ্যেই থাকতে হবে। সংবিধানে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ থাকলে আপনি যেটা বললেন, এটাতে কোনো অসুবিধা নেই।’

ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, “বিএনপি যদি বলে, ‘আমরা নির্বাচনে আসব।’ নির্বাচনে এলে তখন এক কথা। তারা নির্বাচন করবেই না তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া। তারা এই সংসদকে চায় না। মন্ত্রিসভা, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ চায়। এসব শর্তারোপের মধ্যে আমরা কীভাবে বলব যে আপনারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিতে আসুন বা অন্য কোনো মন্ত্রণালয় আপনাদের দিচ্ছি? তাদের তো সম্পূর্ণ উত্তর আর দক্ষিণ মেরুর অবস্থান।”

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিএনপিকে নির্বাচনকালীন সরকারে রাখার প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে কী ভাবছে রাজপথে আন্দোলনরত বিএনপি। ওবায়দুল কাদেরের প্রস্তাব ‘জনগণকে বিভ্রান্ত করার আরেকটি চক্রান্ত’ বলে মনে করেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

গত মঙ্গলবার দলের সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনকালীন সরকার হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ২০১৮ সালে আমরা শেখ হাসিনাকে বিশ্বাস করে তার সঙ্গে সংলাপে বসেছিলাম। সেই সংলাপে যে সমস্ত কথা তিনি দিয়েছিলেন, সেগুলোর একটাও রক্ষা করেননি। সুতরাং ওবায়দুল কাদেরের কথায় আস্থা রাখা, বিশ্বাস করা এটার প্রশ্নই উঠতে পারে না। এগুলোকে আমি মনে করি, এটা আরেকটি চক্রান্ত জনগণকে বিভ্রান্ত করার। তারা বলবে যে, এ তো আমরা প্রস্তাব দিয়েছি। ওরা শুনছে না, যাচ্ছে না।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বর্তমান সরকার পদত্যাগ করার পর নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের ব্যাপারে আলোচনা হতে পারে, এটিই তাদের অবস্থান।’

বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের জবাবে গতকাল বুধবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপিকে সংলাপ এবং নির্বাচনকালীন সরকারে ডাকা হয়নি। এখানে প্রলোভনের ফাঁদের প্রশ্ন আসে কেন? তিনি সকালে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বৈদ্যুতিক গাড়িতে রূপান্তর সংক্রান্ত বৈঠক ও সক্ষমতা বৃদ্ধির এক কর্মশালা শেষে এ প্রশ্ন করেন।

ওবায়দুল কাদের বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ বিএনপির গণতান্ত্রিক অধিকার, সুযোগ নয়। আওয়ামী লীগ কেন তাদের অনুগ্রহ করবে, ডেকে আনবে? আওয়ামী লীগ তাদের কোনও ফাঁদে ফেলছে না। সরকারের পদত্যাগ, সংসদ বিলুপ্ত ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার এই তিন দাবি বিএনপির। বিএনপির এসব দাবি নিয়ে বিদেশিরা একটি কথাও বলেনি। কোনও চাপ বা প্রস্তাব দেয়নি।

এদিকে গতকাল নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিথ্যাচার করছেন। রিজভী আরো বলেন, ক্ষণে ক্ষণে তাদের বক্তব্য পরিবর্তন হলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া আগামী নির্বাচন হবে না। দেশ-বিদেশের মানুষও তা মেনে নেবে না। সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড.হাছান মাহমুদ গতকাল বুধবার দুপুরে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সাথে সমকালীন বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘আমি আশা করবো বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে, উৎসবমুখর পরিবেশে ভালো নির্বাচন করতে সহায়তা করবে। আর আমরা নির্বাচনকে সামনে রেখে কারো সাথে খেলা শুরু করিনি। আমরা নির্বাচনের সময় খেলতে চাই এবং সেই খেলায় বিএনপিকে আহ্বান জানাবো। আমরা উনাদের সাথে খেলে গোল দিতে চাই।’