আসন্ন গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের জমজমাট লড়াইয়ের ঈঙ্গিত মিলেছে। একদিকে দলীয় মনোনীত প্রার্থী আজমত উল্লাহ খান অন্যদিকে দলেরই নেতা,সিটি করপোরেশনের বহিস্কৃত মেয়র ও গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের মধ্যে নির্বাচনী লড়াই খুবই শক্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দুই নেতাকে ঘিরে গাজীপুর আওয়ামী লীগ এখনই বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
তবে পাল্লা ভারী হচ্ছে বিদ্রোহী প্রার্থী জাহাঙ্গীরের। কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে দলীয় প্রার্থী আজমত উল্লাহ খানকে। দুই নেতার লড়াইয়ে যুক্ত হতে পারে বিএনপি ঘরানার মেয়র প্রার্থী কারান্তরীণ বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম সরকারের ছেলে সরকার শাহ নূর ইসলাম রনি। বিএনপি দলীয়ভাবে নির্বাচন বর্জনের কথা বললেও প্রার্থীরা বলছেন,তারা কেন্দ্রীয় নেতাদের মৌন সমর্থন পাচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে বিএনপি প্রার্থীর জন্য বিশেষ সুবিধা হতে পারে আওয়ামী লীগের দুই নেতার লড়াই।
আসন্ন পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মধ্যে সবার আগে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গাজীপুর সিটির নির্বাচন। আগামী ২৫ মে এই সিটির নির্বাচন। গত বৃহস্পতিবার আগ্রহী প্রার্থীরা মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছেন। এ নির্বাচনে কোমর বেঁধে নেমেছেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বহিস্কৃত মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম। তবে দল জাহাঙ্গীর আলমের বহিস্কাদেশ তুলে নিয়েছে গত ১ জানুয়ারি। সেই থেকে জাহাঙ্গীর আলম মাঠে সক্রিয় ।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেই ভিডিওতে বিতর্কিত মন্তব্য করায় ওই বছরের ১৯ নভেম্বর তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ নভেম্বর তাকে মেয়র পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এরপর মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে তার পদে পুনর্বহাল করার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন ৬১ কাউন্সিলর। তারা এখন সবাই জাহাঙ্গীরের পক্ষে প্রচারণায় রয়েছে। তবে জাহাঙ্গীর আলম বৃহস্পতিবার মনোনয়ন পত্র জমা দিয়ে সাংবাদিকদের কাছে তিনি গুম বা গ্রেফতার হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি সম্প‚র্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দাঁড়িয়েছি। আমার বিরুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্র হতে পারে, আমি গ্রেপ্তার হতে পারি, আমাকে গুম করা হতে পারে। আবার আমার পায়ে শিকলও পড়তে পারে।‘ তিনি জনগণের কাছে সহযোগিতা চেয়ে বলেন, ‘আমার নির্বাচন নৌকার বিরুদ্ধে নয়, আমার নির্বাচন ব্যক্তির বিরুদ্ধে। আমার সঙ্গে ভোটে লড়তে হলে ষড়যন্ত্র করে নয়, ব্যক্তি হিসেবে আমার সঙ্গে লড়তে আসেন। আমি ভোটের মাঠে আছি।’
এদিকে, গাজীপুর সিটি নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের জন্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় টিমের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে টিম লিডার হিসেবে আছেন দলের সভাপতিমÐলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। নির্বাচনের সমন্বয়ক করা হয়েছে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজমকে। উপদেষ্টা করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হককে। এছাড়া আরও ২৫ কেন্দ্রীয় নেতাকে এ টিমের সদস্য করা হয়েছে। টিমের একজন সদস্য দেশ বর্তমানকে বলেন, প্রতীক বরাদ্দ করার পর থেকে পুরো টিম দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নামবেন। তার আগে দলীয় নেতাকর্মীদেরকে নিয়ে প্রস্তুতিমূলক সভা করবেন।
জাহাঙ্গীর আলম দেশ বর্তমানকে বলেন, আমি আরেকবার পরীক্ষা দিতে প্রস্তুত। নির্বাচনে সাধারণ জনগণকে যে ওয়াদা দিয়েছিলাম, আমাকে বরখাস্ত করে তাতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে। বাকি কাজ শেষ করতে চ্যালেঞ্জটা নিতে যাচ্ছি। এ লক্ষ্যেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নিজে মনোনয়ন ফরম তুলেছি। এছাড়া মায়ের নামেও মনোনয়ন ফরম তোলা হয়েছে।
তবে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে জাহাঙ্গীর আলমের প্রার্থী হওয়া নিয়ে কোনো চাপ অনুভব করছেন না আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আজমত উল্লা খান। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই আওয়ামী লীগ পরিবার। যারা প্রকৃত আওয়ামী লীগ, তারা সবাই আমার সঙ্গে আছে। সবাই আমার পক্ষে আছে। এখানে জাহাঙ্গীর নিয়ে কোনো চাপ ফিল (অনুভব) করার কারণ নেই।
আজমত উল্লা খান বলেন, ‘আপনারা জানেন, আমি দীর্ঘ ১৮ বছর টঙ্গী পৌরসভার মেয়র ছিলাম। এই ১৮ বছরে আমার বিরুদ্ধে একটা দুর্নীতির রেকর্ড নেই। তাই জনগণও এমন কাউকে চাইবেন, যিনি দুর্নীতিমুক্ত। সেই দিক থেকে জনগণ আমার পাশে আছেন। তাঁরা আমাকেই ভোট দেবেন।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাময়িক বরখাস্ত মেয়র জাহাঙ্গীর আলম দল থেকে বহিষ্কার থাকা অবস্থায় তাঁর সঙ্গে অনেক নেতা-কর্মীর সখ্য ছিল। ওই সময় মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লা খান ও সাধারণ সম্পাদক আতাউল্লাহ মন্ডল দুই শতাধিক নেতা-কর্মীকে কারণ দর্শাও (শোকজ) নোটিশ দিয়েছিলেন। কারণ দর্শানোর জবাবও দিয়েছিলেন অনেকে। আসন্ন সিটি নির্বাচনে সেই সব নেতাকে মাঠে নামানো দলীয় প্রার্থী আজমত উল্লার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন দলের নেতা-কর্মীরা।
চ্যালেঞ্জের কারণ খুঁজতে গিয়ে আরো জানা গেছে,জাহাঙ্গীর আলমকে ২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর মেয়র পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত এবং দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কারের পর তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে দুই শতাধিক নেতাকে কারণ দর্শাও নোটিশ দেয় মহানগর আওয়ামী লীগ। গত বছরের ১ জুন গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. আতাউল্লাহ মন্ডল ওই কারণ দর্শাও নোটিশে স্বাক্ষর করেন। কারণ দর্শাও নোটিশপ্রাপ্ত নেতাদের মধ্যে ১৯ জন গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটিতে বিভিন্ন পদে ছিলেন।
অপর শতাধিক ব্যক্তি নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের কমিটিতে থাকা নেতা-কর্মী। কারণ দর্শাও পাওয়া অনেক নেতাকে দলে সক্রিয় দেখা গেলেও ক্ষোভ কাটেনি তাঁদের। এ ছাড়া গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৭৬ জন কাউন্সিলরের মধ্যে ৬১ জন সাময়িক বরখাস্ত মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের পক্ষে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিলেন। এই কাউন্সিলরদেরও কারণ দর্শাও নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এখন ওই সব কাউন্সিলরকেও নৌকার পক্ষে কাজ করানো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন নেতারা।
কারণ দর্শাও নোটিশ পাওয়া নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের আগের কমিটির সহসভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রউফ, সহসভাপতি ও গাজীপুর আদালতের জিপি আমজাদ হোসেন, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ও গাজীপুর জেলা পরিষদের সাবেক প্যানেল চেয়ারম্যান এস এম মোকছেদ আলম, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মজিবুর রহমান, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সিটি কাউন্সিলর রফিকুল ইসলাম, দপ্তর সম্পাদক মনির হোসেন মিয়া, সহদপ্তর সম্পাদক মাজহারুল আলম, ক্রীড়া সম্পাদক মো. আসাদুজ্জামান, সদস্য ও সিটি কাউন্সিলর আজিজুর রহমান, সদস্য রজব আলী, সদস্য হাজি আবদুর রশিদ, উপদেষ্টা রিয়াজ মাহমুদ আয়নাল প্রমুখ।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দাখিল করেছেন কারান্তরীণ বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম সরকারের ছেলে সরকার শাহ নূর ইসলাম রনি।
গত নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের ভাই নুরুল ইসলাম সরকার গাজীপুরের সাবেক সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ডাদেশপ্রাপ্ত হয়ে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন।
দল নির্বাচনে যাচ্ছে না কিন্তু আপনি প্রার্থী হচ্ছেন; এ অবস্থায় ভোটের মাঠ থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য দলের কোনো চাপ আসছে কি না- জানতে চাইলে গাজীপুর মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলে যুক্ত থাকা নূর বলেন, “দলের কোনো চাপের তো প্রশ্নই আসে না।” তাহলে কি দল থেকে সমর্থন পাচ্ছেন- জবাবে শাহ নূর বলেন, “চাপ তো পাচ্ছিই না; বরং দল মৌন সমর্থন দিচ্ছে ইনশাল্লাহ।”
বিএনপি ছাড়াও এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক উপ-কমিটির সাবেক সদস্য ৩৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল্লাহ আল মামুন মন্ডল, জাহাঙ্গীর আলমের মা জায়েদা খাতুন , জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী সাবেক সচিব এম এম নিয়াজ উদ্দিন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী গাজী আতাউর রহমান , গণফ্রন্টের আতিকুল ইসলাম আতিক, ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. হারুন অর রশীদ তাদের মনোনয়ন দাখিল করেছেন।
নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, গাজীপুর সিটি নির্বাচনের ৫৭টি ওয়ার্ডে ভোট নেওয়ার জন্য ৪৭৮টি কেন্দ্র থাকবে, কক্ষ থাকবে ৩৪৯১টি। এছাড়া অস্থায়ী ভোটকক্ষের সংখ্যা ৪৮৬টি। নির্বাচনে ৪৭৮জন প্রিসাইডিং অফিসার, ৩ হাজার ৪৯১ জন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং ৬ হাজার ৯৮২ জন পোলিং অফিসার থাকবেন।
তফসিল অনুযায়ী আজ ৩০ এপ্রিল মনোনয়নপত্র যাচাই বাছাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহার ৮ মে এবং প্রতীক বরাদ্দ হবে ৯ মে। ইভিএমের মাধ্যমে ২৫ মে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ করা হবে।