বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের (ডিজি) ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মো. নাসির উদ্দিনকে ঘিরে সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার বলে দাবি করেছেন তিনি ও সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের অভিযোগ, একজন সৎ, দায়িত্বশীল ও পেশাদার সরকারি কর্মকর্তাকে পরিকল্পিতভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা এবং তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের সুনাম ক্ষুণ্ন করতেই যাচাই-বাছাইহীন ও অপ্রমাণিত নানা অভিযোগ একত্র করে ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর অধিকাংশই পুরোনো, অপ্রমাণিত এবং বিভিন্ন ব্যক্তি বা পক্ষের বক্তব্যনির্ভর। অথচ অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি পরীক্ষা কিংবা কোনো নিরপেক্ষ তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল উপস্থাপন ছাড়াই সেগুলো এমনভাবে প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে পাঠকের মনে মো. নাসির উদ্দিন সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়।
নাসির উদ্দিন বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রতিটি অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি তাঁর কাছে রয়েছে। প্রয়োজন হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষ কিংবা আদালতে তিনি সেসব নথি উপস্থাপন করবেন। তাঁর ভাষ্য, একটি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিরোধকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁর পেশাগত দায়িত্ব, সরকারি পদ ও ব্যক্তিগত সততার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অত্যন্ত দুঃখজনক।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট পারিবারিক বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনাও হয়েছে এবং সমাধানের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু একটি ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ একের পর এক গুরুতর অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ এসব অভিযোগের কোনোটিই যথাযথ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত তথ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়নি।
নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভ্রান্তির অভিযোগ
লেবার সর্দার নিয়োগ এবং সহকারী স্টেশন মাস্টার নিয়োগসংক্রান্ত যেসব অভিযোগ প্রতিবেদনে আনা হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে নাসির উদ্দিনের ব্যক্তিগত অপরাধ বা অনিয়মের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাঁদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত একটি নির্ধারিত বিধিবিধান, দায়িত্ব বণ্টন ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। কোনো কর্মকর্তা একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোনো দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন বলেই সেই সময়ের সব অভিযোগের দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁর ওপর বর্তায় না। অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না; অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণ।
বিশেষ করে ২০১৬ সালের সহকারী স্টেশন মাস্টার নিয়োগের প্রসঙ্গকে বর্তমান সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অনিয়মের অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপনের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের বক্তব্য, কোনো অনুসন্ধান বা অভিযোগের উল্লেখ থাকলেই একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়ে যায় না। চূড়ান্ত তদন্ত, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা আদালতের রায় ছাড়া কাউকে দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে উপস্থাপন করা ন্যায়সংগত নয়।
তাঁদের দাবি, নাসির উদ্দিনের দীর্ঘ সরকারি কর্মজীবনে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা যেকোনো অভিযোগ নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিকভাবে যাচাই করা হোক। এতে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। বরং প্রকৃত সত্য উদঘাটনে আইন ও বিধি অনুযায়ী যেকোনো তদন্তে তিনি পূর্ণ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
সম্পদ নিয়ে অভিযোগেরও প্রমাণ দাবি
নাসির উদ্দিনের বাড়ি, জমি-প্লট, সম্পদ কিংবা পরিবারের সদস্যদের ব্যবসা নিয়ে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও কোনো সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন বা অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি বলে জানিয়েছেন তাঁর সংশ্লিষ্টরা।
তাঁদের বক্তব্য, একজন সরকারি কর্মকর্তার সম্পদ নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে তা যাচাইয়ের জন্য দেশে আইন ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অনুমান, ব্যক্তিগত বক্তব্য কিংবা অজ্ঞাত অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে ‘অবৈধ সম্পদের মালিক’ হিসেবে জনসমক্ষে উপস্থাপন করা ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারের সামাজিক মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
তাঁরা বলেন, নাসির উদ্দিন তাঁর আয়-সম্পদ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি করতে প্রস্তুত। আইনসম্মত ও নিরপেক্ষ যেকোনো অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলেও তাঁদের বিশ্বাস।
ব্যক্তিগত বিরোধকে পেশাগত চরিত্রহননের অভিযোগ
প্রকাশিত প্রতিবেদনে নাসির উদ্দিনের ব্যক্তিগত ও বৈবাহিক জীবন নিয়েও নানা অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে। এমন একটি সংবেদনশীল ব্যক্তিগত বিষয়কে তাঁর সরকারি দায়িত্ব, পেশাগত সততা ও কর্মজীবনের সঙ্গে মিলিয়ে জনসমক্ষে উপস্থাপন করাকে তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চরিত্রহননের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
তাঁর ভাষ্য, পারিবারিক বিরোধের অভিযোগেরও নির্ধারিত আইনগত ও বিচারিক প্রক্রিয়া রয়েছে। কোনো একটি পক্ষের বক্তব্যকে একতরফাভাবে উপস্থাপন করে অপর পক্ষকে জনসমক্ষে দোষী বা অপরাধী হিসেবে চিত্রিত করা সুষ্ঠু ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
‘সিন্ডিকেট’ ও অর্থসংক্রান্ত অভিযোগও প্রত্যাখ্যান
বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন কাজ, কথিত অর্থ সংগ্রহ কিংবা কোনো ‘সিন্ডিকেটের’ সঙ্গে নাসির উদ্দিনের সম্পৃক্ততার যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলোও তিনি ও তাঁর সংশ্লিষ্টরা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তাঁদের দাবি, এসব গুরুতর অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তদন্ত প্রতিবেদন, আদালতের পর্যবেক্ষণ কিংবা আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রমাণ উপস্থাপন না করেই তাঁকে বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
তাঁদের মতে, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করা মানেই প্রতিষ্ঠানের সব সিদ্ধান্ত, কার্যক্রম বা অভিযোগের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বার্থের সম্পর্ক রয়েছে—এমন ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করে প্রমাণভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা নির্ধারণ করা উচিত।
আইন ও সত্যের প্রতি আস্থা
মো. নাসির উদ্দিন বলেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণযোগ্য অভিযোগ থাকলে তিনি আইন অনুযায়ী তার জবাব দিতে প্রস্তুত। তবে মিথ্যা, বিকৃত বা যাচাইহীন তথ্য প্রচার করে তাঁর সামাজিক, পারিবারিক ও পেশাগত সম্মান ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হলে তিনি আইনগত প্রতিকার নেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করেন।
তিনি বলেন, সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, প্রশাসনিক নথি, তদন্তের প্রকৃত অবস্থা এবং অভিযোগের সত্যতা সমান গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। কাউকে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে একের পর এক অপ্রমাণিত অভিযোগ সাজিয়ে প্রকাশ করলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ক্ষতিই করে না, সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা মো. নাসির উদ্দিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ রেলওয়েতে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর কর্মজীবনে গড়ে ওঠা সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতেই সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
তাঁরা বলেন, অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত হোক—এতে নাসির উদ্দিনের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু তদন্তের আগেই অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্যের আবরণে উপস্থাপন করা এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা বিষয় টেনে এনে একজন কর্মকর্তাকে জনসমক্ষে অপরাধীর মতো চিত্রিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
প্রকৃত সত্য উদঘাটনে প্রয়োজন নিরপেক্ষতা
নাসির উদ্দিন ও তাঁর সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রতিটি অভিযোগ যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক। কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এতে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। একইভাবে অভিযোগগুলো মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রমাণিত হলে একজন সরকারি কর্মকর্তার সম্মান ক্ষুণ্ন ও মানহানির জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তাঁদের মতে, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত বিরোধের জেরে একজন কর্মকর্তার দীর্ঘ কর্মজীবন, সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক সম্মান বিনষ্ট করার প্রবণতা বন্ধ হওয়া জরুরি। সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব যেমন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করে জনসমক্ষে তুলে ধরা, তেমনি অভিযোগ ও প্রমাণিত সত্যের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্যকে সমান গুরুত্ব দেওয়াও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অপরিহার্য অংশ।
মো. নাসির উদ্দিন বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি আমার কাছে রয়েছে। কোনো অভিযোগের সত্যতা থাকলে আইন অনুযায়ী তার জবাব দেব। কিন্তু ব্যক্তিগত বিরোধকে ব্যবহার করে কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারের মাধ্যমে আমার দীর্ঘ কর্মজীবনের সততা ও সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হলে আমি আইনগতভাবে আমার অধিকার রক্ষা করব।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে তাঁর সম্পর্কে কোনো অভিযোগ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট নথি ও তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা হবে এবং সব পক্ষের বক্তব্য নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন করা হবে।