চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেছেন, কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্বের মধ্যে বিরল একজন কবি। তিনি শুধু লিখেই থেমে থাকেননি, নিজের লেখাকে বিশ্বাস ও ধারণ করে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামও করেছেন। সাহিত্যিকেরা সাধারণত কলমের অস্ত্র ধারণ করেন, কিন্তু সত্যিকারের সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে সমাজ পরিবর্তনের অংশীদার হওয়া সাহিত্যিকের সংখ্যা খুবই কম। এ ক্ষেত্রে কবি নজরুল ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী।
সোমবার (৩১ আগস্ট) চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে নজরুল বর্ষ উপলক্ষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক দুই মাসব্যাপী জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহযোগিতায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
বিভাগীয় কমিশনার বলেন, বর্তমান সরকার ২০২৬-২৭ সালকে নজরুল বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছে। শুধু ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে নজরুল চর্চার জন্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক দুই মাসব্যাপী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্ম ও জীবনাদর্শকে নতুন প্রজন্মের চিন্তা-চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা।
তিনি বলেন, কবি নজরুল ছিলেন তারুণ্যের প্রতীক। জাতীয় জীবনের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম তাঁর চিন্তা ও আদর্শ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে। তিনি শুধু কবিতা, গান ও সাহিত্য রচনা করেননি; নিজের আদর্শে বিশ্বাস রেখে সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামেও অংশ নিয়েছেন।
প্রতিযোগী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমরা চাই, আপনারা এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নজরুলের চিন্তা-চেতনা ধারণ করুন এবং দেশে সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও সমৃদ্ধির প্রতিষ্ঠায় একজন করে সৈনিক হয়ে উঠুন। কবি নজরুল যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন এবং যে সংগ্রাম করেছেন, সেই আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার নজরুল বর্ষ ঘোষণা করেছে তাঁর আদর্শকে সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। শিক্ষার্থীরা এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যে শিল্প ও নৈপুণ্য প্রদর্শন করবে, তা শুধু আনন্দ দেওয়ার বিষয় নয়; এর মাধ্যমে নজরুলের চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতি চর্চা অব্যাহত থাকবে।
বিভাগীয় কমিশনার বলেন, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় নিয়ম অনুযায়ী প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান নির্ধারণ করতে হয় এবং পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে যারা অংশগ্রহণের সাহস ও দক্ষতা দেখিয়েছে, তারাই বিজয়ী। শিক্ষার্থীদের হাতে যে মশাল রয়েছে, সেটি নজরুলের চিন্তার মশাল। এই মশাল চারদিকে ছড়িয়ে দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, কবি নজরুলের সৃষ্টিকে লালন করে সেই আদর্শে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। শিক্ষার্থীরা তরুণ প্রজন্মের অহংকার। সংস্কৃতিকে লালন-পালনের মাধ্যমে তারা সমাজে ইতিবাচক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে পারে।
তিনি বলেন, বিদ্রোহী কবি, জাতীয় কবি ও দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রতিটি ধর্ম, অনুষ্ঠান, দেশপ্রেম, আন্দোলন ও তরুণ সমাজের জন্য আজও প্রাসঙ্গিক। শতবর্ষ পরেও তাঁর মেধা, যোগ্যতা ও লেখনীর মাধ্যমে তিনি মানুষের মাঝে প্রাসঙ্গিকতা ছড়িয়ে যাচ্ছেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, ১২৭তম নজরুল জয়ন্তী উপলক্ষে ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে পর্যন্ত নজরুল বর্ষ ঘোষণা করা হয়েছে। নজরুলের ধারণা ও চিন্তাকে লালন ও ধারণ করতে হবে। তরুণ প্রজন্মই আগামী দিনের বাংলাদেশকে সাজাবে। তাদের মধ্যে মূল্যবোধ ও নৈতিকতা গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে সমাজের বিভিন্ন স্তরে নৈতিক অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় নজরুল বর্ষের আয়োজন আগামী প্রজন্মের জন্য বড় ধরনের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। নজরুলের প্রেম, সাম্য, মানবতা ও সৃষ্টিকে ধারণ করে কাঙ্ক্ষিত ও নিরাপদ নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমরা কবি নজরুলকে ধারণ করে বড় হয়েছি। ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কবি নজরুল ওতপ্রোতভাবে মিশে আছেন। অন্যায়, অবিচার ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন বিদ্রোহী। জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর বিদ্রোহী চেতনা তরুণদের প্রভাবিত করেছে।
তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে নজরুল আমাদের অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষের সম্প্রীতির যে সংস্কৃতি, নজরুলের লেখনীতে তা বিকশিত হয়েছে। অন্যায় ও অবিচার দেখলেই তিনি সাম্যের গান গেয়েছেন এবং মানুষের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছেন।
ডিআইজি বলেন, আমাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবন, ইসলামী সংগীত, শ্যামাসংগীত, জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবন—সব ক্ষেত্রেই নজরুলের উপস্থিতি রয়েছে। কবি নজরুলের স্মৃতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধারণ করতে পারলে জাতি সঠিক পথে এগিয়ে যেতে পারবে। নজরুলকে ধারণ করে সাম্য ও সম্প্রীতির গান গাইতে হবে এবং অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখতে হবে।
অনুষ্ঠানে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. মিজানুর রহমান ও জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন।
জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার সৈয়দ মুহম্মদ আয়াজ মাবুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
পরে একক ও দলীয় নজরুল সংগীত, দলীয় নৃত্য এবং কবিতা আবৃত্তি পরিবেশন করা হয়।