পাটুরিয়া-ঢাকা রুটে সেলফি’র দৌরাত্ম্য: পারমিটহীন বাস, বেপরোয়া রেষারেষি ও নেপথ্যে লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষকে রাজধানীতে প্রবেশে প্রধানত নির্ভর করতে হয় মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার পাটুরিয়া ফেরিঘাটের ওপর। প্রতিদিনের হাজারো যাত্রীর এই বিপুল চাহিদাকে পুঁজি করে ঢাকা-পাটুরিয়া মহাসড়কে নীলাচল, পদ্মাসহ একাধিক পরিবহন চালু থাকলেও বর্তমানে একচ্ছত্র রাজত্ব চালাচ্ছে ‘সেলফি পরিবহন’। অভিযোগ উঠেছে, যথাযথ রুট পারমিট ছাড়াই চালকদের বেপরোয়া প্রতিযোগিতা, যাত্রী হয়রানি এবং মাসে অন্তত ২০ লাখ টাকার চাঁদাবাজির জাল বিছিয়ে মহাসড়কে এই নৈরাজ্য তৈরি করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, রুট পারমিটের তোয়াক্কা না করেই প্রায় চার শতাধিক বাসের একটি বিশালাকার সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে। পাটুরিয়া টার্মিনাল থেকে প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয় সেলফি পরিবহনের বাস। তবে যাত্রা শুরুর পর থেকেই যাত্রী তোলার জন্য শুরু হয় এক বাসের সঙ্গে অন্য বাসের বিপজ্জনক রেষারেষি। ওভারটেক করাকে কেন্দ্র করে প্রায়শই মহাসড়কের মাঝে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হয়, যার দরুন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে। চালকদের এমন অবিবেচকমূলক আচরণের কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা, পঙ্গুত্ব বরণ করছেন সাধারণ মানুষ এবং ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ।

বাসের বেপরোয়া গতি ও স্টাফদের ব্যবহারে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রীরা। তাদের অভিযোগ, হেলপার ও চালকদের ব্যবহার অত্যন্ত অপমানজনক। গতি প্রতিযোগিতার কাছে যাত্রীদের জীবন যেন জিম্মি হয়ে পড়েছে, আর প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো শিকার হতে হয় মারাত্মক হেনস্থার।
গেটলক পাসের নামে দৈনিক ও মাসিক চাঁদাবাজি
আইনি অনুমোদন ছাড়া রুট পারমিটহীন বাস চালানো ও লাইনে প্রাধান্য বজায় রাখতে নিয়মিত দিতে হয় মোটা অঙ্কের চাঁদা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিটি বাস থেকে দৈনিক ৩৫০ টাকা করে ‘জিপি’ (গেটলক পাস) বাবদ অর্থ আদায় করা হয়। পাটুরিয়ার স্থানীয় কাউন্টার থেকে সুলতান নামের এক ব্যক্তি এই চাঁদাবাজি করেন ও মূল সংগ্রাহক হিসেবে এটি পরিচালনা করেন। আর নানা স্তরে চাঁদার ভাগবাটোয়ারা পৌঁছে দেন তিনি।

হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে চলাচলকারী ২০০টি বাস থেকে শুধু জিপি বাবদই আদায় হয় প্রায় ৭০ হাজার টাকা, যা মাসে গিয়ে দাঁড়ায় ২১ লাখ টাকায়। শ্রমিক ও কাউন্টারকর্মীদের দাবি- এই টাকা দিয়ে কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হয়। তবে কাউন্টারের দায়িত্বরত ৬ জন কর্মচারীর মাসিক সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা বেতনের হিসাব বাদ দিলেও, প্রতি মাসে অতিরিক্ত উদ্বৃত্ত থাকে প্রায় ২০ লাখ টাকা।

পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত অর্থ স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ভাগবাটোয়ারা করা হয়। সংগৃহীত অর্থ পৌঁছে দেওয়ার কাজটি সুনির্দিষ্টভাবেই সমন্বয় করেন সুলতান।

পরিবহন খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতে, মহাসড়কের এই বিশাল চাঁদাবাজির নেপথ্যে যারা কলকাঠি নাড়ছেন, তারা সর্বদাই আড়ালে থেকে যাচ্ছেন। মাঠপর্যায়ে কেবল একজন সংগ্রাহক ধরে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিবহন শ্রমিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সুলতান শুধু হুকুমের গোলাম, সে নির্দিষ্ট ব্যাগে টাকা গুছিয়ে ওপর তলায় পাঠায়। তাকে ধরে কোনো লাভ নেই, মূল প্রভাবশালী কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে পরদিনই নতুন কেউ এসে ওই আসনে বসবে।”

অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত সুলতানের কাছে জানতে চাইলে প্রথমে তিনি জিপির টাকা দিয়ে কেবল স্টাফদের বেতন দেওয়ার কথা দাবি করেন। কিন্তু মাসিক আয়-ব্যয়ের অসংগতি এবং বিপুল অঙ্কের অতিরিক্ত টাকার উৎস নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সুর বদলে বলেন, উদ্বৃত্ত টাকা ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বিষয়টি চেপে যাওয়ার অনুরোধ করে তিনি আরও দাবি করেন, পূর্বেও একাধিক সংবাদকর্মী (নাম উল্লেখ) সংবাদ প্রকাশ ও ভয় দেখালে তাদের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করা হয়েছে।

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের এই রেষারেষি ও বিশৃঙ্খলা ঠেকানোর বিষয়ে এরআগে বরঙ্গাইল হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হারুন অর রশিদ জানান, মহাসড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তারা নিয়মিত অভিযান ও মামলা পরিচালনা করছেন। বিশেষ করে উথলি মোড়সহ ব্যস্ততম পয়েন্টগুলোতে যেন বাস আটকে রেখে কৃত্রিম যানজট তৈরি করা না হয়, সে ব্যাপারে তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।

অন্যদিকে, চাঁদাবাজির মতো অপরাধের বিষয়ে শিবালয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে।

তবে, স্থানীয় বাসিন্দা ও সাধারণ পরিবহন শ্রমিকদের মতে, কেবল পুলিশি তদারকির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে এই নৈরাজ্যের মূল নেপথ্য নায়কদের চিহ্নিত করা জরুরি। সুলতানের কল ডিটেইলস (সিডিআর) ও ব্যাংক লেনদেন পর্যালোচনা এবং বিআরটিএ-এর মাধ্যমে বাসের রুট পারমিটের সঠিকতা যাচাই করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলেই কেবল ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত সম্ভব।