শিবালয়ে সিভিল সার্জনের অভিযানে সিলগালা ২ প্রতিষ্ঠান, ছাড় পেলেন মারাত্মক অনিয়মকারীরা: পদক্ষেপ নিয়ে ক্ষোভ
মানিকগঞ্জের শিবালয়ে সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে গড়ে ওঠা অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে জেলা সিভিল সার্জন ডা. আইভি ফেরদৌসের নেতৃত্বে ঝটিকা অভিযান চালানো হয়েছে। তবে দীর্ঘ ৬-৭ বছর ধরে অনুমোদনহীন দুটি প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হলেও বায়োমেডিকেল বর্জ্য, ক্ষতিকর রেডিয়েশন ও অপচিকিৎসার হাতেনাতে প্রমাণ মেলা সত্ত্বেও সিংহভাগ অনিয়মকারী প্রতিষ্ঠানকে কোনো শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। মারাত্মক সব অনিয়ম দেখার পরও প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নিয়ে সময়সীমা বা ছাড় দেওয়াকে ‘দায়সাড়া, লোকদেখানো ও অনিয়মকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা’ আখ্যা দিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়ে শিবালয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ঠিক বিপরীত পাশে উথলি এলাকার বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে এ অভিযান চালানো হয়।
স্থানীয়রা ও সংশ্লিষ্টরা জানায়, সংবাদমাধ্যমে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের অন-কল কমিশন বাণিজ্য, ডিউটি ফাঁকি এবং অবৈধ বেসরকারি সেন্টারের নৈরাজ্য নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের পরই মূলত নড়েচড়ে বসে জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসন। অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক দেখা দেয়; রোগী ভাগানো দালাল চক্র গা ঢাকা দেয় এবং ডিউটি ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে আসা সরকারি চিকিৎসকরা স্থান ত্যাগ করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, অভিযান চলাকালে উথলি এলাকার একাধিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ অনিয়মের চিত্র ধরা পড়েছে। এরমধ্যে একতা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে লাইসেন্সহীন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ল্যাবে এক মাস আগের ব্যবহৃত ব্লাড স্যাম্পলের টিউব সংরক্ষণ করার প্রমাণ পাওয়া যায়। পুরাতন টিউব দিয়ে মনগড়া পরীক্ষা চালিয়ে রোগীদের রিপোর্ট দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করা হয়।
ইছামতি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পূর্বে অনুমোদনহীন হাসপাতাল কার্যক্রম এবং অপচিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে। তারপরও প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৬-৭ বছর ধরে লাইসেন্স ছাড়াই চলছিল। এটিকেও সিলগালা করে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
উথলি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সিভিল সার্জন প্রথমে এই সেন্টারে প্রবেশ করেন, যেখানে তখন রোগীদের ভিড়ে রীতিমতো ‘হাট’ বসেছিল। হাসপাতালের বহির্ বিভাগ থেকে সরকারি চিকিৎসকদের লিখে দেওয়া কমিশন্ড প্রেসক্রিপশন নিয়ে পরীক্ষা করাতে এসেছিলেন রোগীরা। সিভিল সার্জন লাইসেন্স ও অন্যান্য কাগজ পরীক্ষা করলেও অন্যান্য নথিপত্র হালনাগাদ না থাকা সত্ত্বেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে বেরিয়ে আসেন।
মা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কেবল ‘ক্যাটাগরি-সি’ (প্রাথমিক ল্যাব টেস্ট) অনুমোদন থাকলেও সেখানে বেআইনিভাবে চলছিল ডিজিটাল এক্স-রে, ইসিজি ও আলট্রাসনোগ্রাম। কোনো সনদপ্রাপ্ত প্যাথলজিস্ট ছাড়া মালিক মো. রহিজ উদ্দিন একা হাতেই সব পরীক্ষা চালাচ্ছিলেন। এছাড়া পরমাণু শক্তি কমিশনের (AERB) অনুমোদনহীন রেডিয়েশন, ২০২৪ সালে মেয়াদ উত্তীর্ণ ডিজিএইচএস লাইসেন্স এবং মহাসড়কে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলার প্রমাণ মেলার পরও অদৃশ্য কারণে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
আল মদিনা চক্ষু হাসপাতালের জন্য হাসপাতাল ও ড্রাগের কোনো প্রকার লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও ‘মানবিক দৃষ্টিকোণ’ দেখিয়ে হাসপাতালটির কার্যক্রম চালুর অনুমতি দেওয়া হয় এবং নবায়নের জন্য দুই মাসের সময় দিয়ে মুচলেকা নেওয়া হয়।
আল ইহসান ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দক্ষ লোকবল, ছাড়পত্র ও নথিপত্র হালনাগাদ না থাকা সত্ত্বেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু পরিদর্শন শেষ করে প্রতিনিধি দলটি।
সবুজ পাহাড় ডায়াগনস্টিক সেন্টার মাত্র দুই দিন আগে বন্ধ রাখার দাবি করেন মালিক বুলবুল আহমেদ এবং কেবল ড্রাগ লাইসেন্স থাকায় তাঁদের ফার্মেসি চালুর সুযোগ রেখে আসা হয়।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে সিভিল সার্জন ডা. আইভি ফেরদৌস বলেন, “অধিকাংশ ক্লিনিকের লাইসেন্স আপডেট নেই। একতা ও ইছামতি দীর্ঘদিন ধরে লাইসেন্স ছাড়া চলায় আপাতত বন্ধ করা হয়েছে। পরিবেশ ও লাইসেন্স নবায়ন করলে তারা আবার চালুর অনুমতি পাবে। তবে মানবিক কারণে আল-মদিনা চক্ষু হাসপাতালকে মুচলেকা নিয়ে ২ মাসের সময় দেওয়া হয়েছে।”
তবে সরেজমিনে পুরো অভিযানের সময় কোনো প্রতিষ্ঠানেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (পরিবেশ ছাড়পত্র), ফায়ার সার্ভিস লাইসেন্স কিংবা পারমাণবিক শক্তি কমিশনের অনুমোদন পাওয়া যায়নি। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে বিষাক্ত সিরিঞ্জ ও রক্তের কন্টেইনার ফেলার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের কমিশন বাণিজ্য বহাল রেখে এবং মাত্র দুটি সেন্টার বন্ধের নাটক সাজিয়ে অভিযান শেষ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ অবৈধ চিকিৎসাসংক্রান্ত অনিয়ম উচ্ছেদ করার বদলে অসাধু চক্রকে পরোক্ষভাবে প্রশ্রয় দেবে, যার ফলে সাধারণ রোগীদের ভোগান্তি ও অর্থ শোষণ অব্যাহতই থাকবে।