চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনাল: দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার

বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যের সক্ষমতা বাড়াতে দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনাল প্রকল্প এখন বাস্তবায়নের পথে। নীতিগত অনুমোদনের পর প্রকল্পের বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে চলছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শেষ হলে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ হবে।

দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ সমুদ্রবাণিজ্য বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তবে কর্ণফুলী নদীকেন্দ্রিক এ বন্দরের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বড় আকারের জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারে না। বর্তমানে সর্বোচ্চ ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্য, ৯ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফট এবং প্রায় ২ হাজার ৪০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ পরিচালনা সম্ভব হয়, তাও নির্দিষ্ট জোয়ারের সময়।

এ কারণে বড় জাহাজগুলোকে সিঙ্গাপুর, কলম্বোসহ বিভিন্ন ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরে পণ্য খালাস করে ছোট জাহাজে বাংলাদেশে পাঠাতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় ও সময়—দুইই বেড়ে যায়। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের গড় অপেক্ষার সময় প্রায় তিন দিন হওয়ায় প্রতিটি জাহাজকে অতিরিক্ত প্রায় ৪৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত ব্যয় বহন করতে হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বে টার্মিনাল চালু হলে ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্য, ১১ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফট এবং প্রায় ৪ হাজার ৮০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারবে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে—জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর না করে ২৪ ঘণ্টা জাহাজ পরিচালনা সম্ভব হবে। এতে জাহাজের অপেক্ষার সময় কমবে, পরিবহন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং আমদানি করা পণ্যের দামেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ব্যবসায়ী ও বন্দরসংশ্লিষ্টদের মতে, বে টার্মিনাল দেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্য চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও দ্রুত ও দক্ষ হবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্পায়নের প্রসার এবং জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তারা মনে করেন।

পতেঙ্গা উপকূলের উত্তর হালিশহর-আনন্দবাজার সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর এলাকায় নির্মাণাধীন এই টার্মিনালে প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্রেকওয়াটার, নতুন অ্যাক্সেস চ্যানেল, ড্রেজিং সুবিধা, দুটি কন্টেইনার টার্মিনাল, একটি মাল্টিপারপাস টার্মিনাল, আধুনিক কন্টেইনার ইয়ার্ড, সড়ক ও রেল সংযোগসহ প্রয়োজনীয় সহায়ক অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রায় ১৩ হাজারের বেশি মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বে টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্প এলাকায় বিদ্যমান সামুদ্রিক প্রতিবেশ রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার বিষয়গুলো পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

প্রকল্পটির সামুদ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ৬৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তা দিচ্ছে। পাশাপাশি টার্মিনাল পরিচালনায় আন্তর্জাতিক বন্দর অপারেটরদের বিনিয়োগের সম্ভাবনাও রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক জানান, বর্তমানে প্রকল্পের টেকনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট ও টু-ডি সিমুলেশন শেষ হয়েছে এবং থ্রি-ডি সিমুলেশনের কাজ চলছে। আগামী বছরের মধ্যে মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সরকার প্রকল্প বাস্তবায়নে আন্তরিক। বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। বর্তমান গতি বজায় থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পটি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বে টার্মিনাল শুধু একটি নতুন বন্দর নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সামুদ্রিক বাণিজ্য, শিল্পায়ন, রপ্তানি সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির অন্যতম কৌশলগত বিনিয়োগ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দর আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক সমুদ্রবন্দর হিসেবে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে পৌঁছাবে এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।