১৬ হাজার নাবিকের অর্ধেকই বেকার
ভিসা জটিলতা, সিওসি ইস্যুতে দীর্ঘসূত্রতাসহ নানা কারণে ভাবমূর্তি সংকটে বাংলাদেশ
আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যে নাবিকের প্রচুর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বাজার ধরতে পারছে না বাংলাদেশ। প্রতি বছর সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় দুই হাজার নাবিক (ক্যাডেট ও রেটিং) বের হলেও অর্ধেকই বেকার। দেশি-বিদেশি জাহাজে ঘুরেফিরে দক্ষ নাবিকের চাকুরি হলেও নতুনদের বাজার সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
কর্মসংস্থানে জোর না দিয়ে প্রতিবছর নাবিকের সংখ্যা বাড়ানোর কারণে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ছাড়া দেশি-বিদেশি জাহাজে কর্মসংস্থানে নানা বাধা, ভিসা পেতে জটিলতা, সিওসি (যোগ্যতা সনদ) ইস্যুতে দীর্ঘসূত্রিতা, বিদেশের বন্দরে গিয়ে জাহাজ থেকে পলায়ন এবং জাল সনদে জাহাজে চাকুরির কারণে সমুদ্রপথে বাংলাদেশ ভাবমূর্তি সংকটে ভুগছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, বিশ্বের নাবিকের সংখ্যা ১৮ লাখের কাছাকাছি। এরমধ্যে ১০ লাখ হলো ক্যাডেট (নটিক্যাল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং) আর বাকি আট লাখ রেটিং (বিভিন্ন ক্যাটাগরীর ক্রু)। আর বাংলাদেশে নাবিকের (ক্যাডেট ও রেটিং) সংখ্যা প্রায় ১৬ হাজার। এরমধ্যে ১১ হাজার ক্যাডেট এবং পাঁচ হাজার রেটিং। বিশ্বের বাজারে বাংলাদেশি নাবিকের সংখ্যা এক শতাংশের নিচে। সমুদ্রপথে নাবিকের বাজার দখলে শীর্ষে রয়েছে এশিয়ার রাষ্ট্র ফিলিপাইন। এর পরে রয়েছে চীন, রাশিয়া। এছাড়া ইন্দোনেশিয়া, মায়ানমার, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও ইউক্রেনের মতো দেশগুলো আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যে বেশ ভালো অবস্থান রয়েছে।
সমুদ্রগামী জাহাজে অফিসার এবং রেটিং-দুই ধরনের জনবল থাকে। কার্গো জাহাজে সাধারণত ২২ থেকে ২৫ জন এবং কনটেইনার জাহাজে ২০ জনের মতো লোকবল প্রয়োজন। তবে জাহাজ মালিকেরা খরচ বাঁচাতে এর চেয়ে কম লোকবল দিয়েও সমুদ্রে জাহাজ পরিচালনা করছে। দেশে সরকারিভাবে ছয়টি মেরিন একাডেমি রয়েছে। এছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে আরও তিনটি একাডেমি রয়েছে। এ নয় একাডেমি থেকে প্রতি বছর নটিক্যাল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং শাখায় ৫৭০ জন ক্যাডেট বের হয়। এছাড়া দুটি সরকারি নাবিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং পাঁচটি বেসরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হতে প্রতি বছর দুই ব্যাচে ১৪৫০ জন নাবিক বের হচ্ছে। সে হিসেবে নয়টি মেরিন একাডেমি ও সাতটি মেরিন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট হতে প্রতি বছর ১৯৭০ জন নাবিক বের হয় জাহাজে চাকুরির আশায়। কিন্তু প্রশিক্ষণশেষে বছরের পর বসে থাকলেও মিলছে না চাকুরি। সরকারি এবং বেসরকারি হিসেবে দেশে ১৬ হাজার নাবিকের মধ্যে আট থেকে হাজার অনবোর্ডে (জাহাজে) আছে আর বাকিরা বেকার। বর্তমানে জাহাজে কর্মরতদের মধ্যে ছয় থেকে সাত হাজার অফিসার ক্যাটাগরীর আর বাকিরা রেটিং। দেশে জাহাজে লোক নিয়োগকারী সংস্থা রয়েছে অর্ধ শতাধিক। এসব এজেন্টরা দেশি-বিদেশি জাহাজে নাবিকদের নিয়োগ দিয়ে থাকে।
প্রবীণ ও নবীন নাবিকদের ভাষ্যমতে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশি নাবিক দক্ষ এবং শ্রমের মজুরিও বেশি। সে তুলনায় সবচেয়ে সস্তা মজুরীতে পাওয়া যায় ফিলিপাইন, বার্মা ও চীনের নাবিক। যার কারণে খরচ বাঁচাতে দেশি-বিদেশি জাহাজ মালিকরা বিদেশি নাবিক নিয়োগে বেশি আগ্রহী। বেসরকারি পর্যায়ে অনুমোদিত নাবিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কে লাইন মেরিটাইম কোং লিমিটেডের কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুন খান বলেন, বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশি নাবিকের চাহিদা প্রচুর রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন বন্দরে গিয়ে জাহজ থেকে পালিয়ে যাওয়া, নাবিকদের যোগ্যতা সনদ প্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা, সিডিসি জালিয়াতির কিছু ঘটনার কারণে বাংলাদেশ ভাবমূর্তি সংকটে রয়েছে।
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ সরকারি কার্য ভবনে সরকারি সমুদ্র পরিবহনে (শিপিং) আগত কয়েকজন নতুন নাবিকের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, একজন নাবিককে ছয় মাসের কোর্সের জন্য আট থেকে দশ লাখ টাকা খরচ করতে হয়। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন নাবিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হতে প্রায় দুই হাজার নাবিক বের হলেও চাকুরি জুটছে মাত্র এক ভাগের। সরকার গণহারে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার পরিবর্তে বেকারের সংখ্যা বাড়াচ্ছে। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,সরকারি নাবিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরও চাকুরি মিলছে না। তবে একটি বেসরকারি জাহাজের ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে নাবিকের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় আমরা সরবরাহ দিতে পারছি না। তবে তিনি স্বীকার করেন, নতুনদের কর্মসংস্থান খুব একটা হচ্ছে না, বেশির ভাগ জাহাজ মালিক দক্ষ নাবিকের দিকে ঝুঁকছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, বিদেশের বন্দরে শোর লিভে গিয়ে আর জাহাজে ফিরে আসেন না অনেকে। আর এ অপবাদ সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশী নাবিকদের বিরুদ্ধে। যার কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজ কোম্পানীগুলোতে বাংলাদেশী নাবিকের চাকুরি মিলছে না। মুষ্টিমেয় কয়েকজন অর্থলোভী নাবিকের কারণে হাজার হাজার নাবিক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন এবং সুনাম সংকটে পড়ছে বাংলাদেশ। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর (শিপিং) সূত্রে জানা যায় গত কয়েক বছরে অন্ততপক্ষে ১৫ জন নাবিকের বিদেশের বন্দরে গিয়ে পালিয়ে গেছে।
তাদের ‘পলাতক’ দেখিয়ে নোটিশ ইস্যুও করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশি ও বিদেশি জাহাজে কর্মরত নাবিকও রয়েছে। স্পেন, ইউ. এস. এ, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, ইতালী ও কলোম্বিয়ার বন্দর থেকে এসব নাবিক পালিয়ে গেলেও দেশে ফিরেনি। এর মধ্যে সরকারি মালিকানাধীন ‘বাংলার অগ্রযাত্রা’ ও ‘বাংলার সমৃদ্ধি’র তিন নাবিকও রয়েছে। এর মধ্যে দুইজন কলম্বিয়ার বন্দরে এবং অন্যজন স্পেনের বন্দর থেকে পালিয়ে যান।
এ প্রসঙ্গে সরকারি সমুদ্র পরিবহন (শিপিং)-এর শিপিং মাস্টার মো. জাকির হোসেন চৌধুরী দেশ বর্তমানকে বলেন, জাহাজ থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা আগের চেয়ে অনেক কমেছে। যারা পালিয়ে গেছেন তাদের বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সিডিসি (কন্টিনিউয়াস ডিসচার্জ সার্টিফিকেট) বাতিল করা হয়।
তিনি বলেন, সরকারের গৃহীত নানা পদক্ষেপের কারণে দেশি-বিদেশি জাহাজের প্রচুর নাবিকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, ফিলিপাইন, চীনের মতো দেশের শ্রমের মজুরী তুলনামূলক স্বস্তা বিধায় বিশ্বে এসব দেশের নাবিকের সংখ্যা বেশি।
নাবিকদের সংগঠন বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএমওএ)-এর সভাপতি ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আনাম চৌধুরী দেশ বর্তমানকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে নাবিকদের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। বাজার ধরতে পারলে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির প্রধান খাত হয়ে ওঠবে এটি। এর জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশিয় জাহাজগুলোতে নাবিকের কাজ করার সুযোগ দিলে তারা দক্ষ হয়ে ওঠবে। এ অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে বিদেশি জাহাজেও আমাদের দেশের নাবিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন,আন্তর্জাতিক বাজারে মোট নাবিকের মাত্র ০.৮ শতাংশ আমরা প্রতিনিধিত্ব করতে পারছি। পিলিপাইন যেখানে প্রতি বছর এ খাতে ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছে, সেখানে আমরা আয় করছি মাত্র ৬০০ মিলিয়ন।