আজ ২৫ মার্চ, ভয়ংকর এক কালোরাতের নাম। ১৯৭১ সালের এই দিনে পৃথিবীর ইতিহাসে এক নৃশংসতম গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল এই ভূখন্ডে। অত্যাধুনিক অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সেদিন ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রথম রাতেই নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল এক লাখেরও বেশি মানুষকে। বিশ্ব মানবতার ইতিহাসে এটি একটি কলঙ্কিত দিন। এত বড় গণহত্যা কোন দেশে আগে কেউ দেখেনি। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধেও এতোবড় নৃশংসতা ও বর্বরতা দেখা যায়নি। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর একটি বিশেষ দল ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডে হানা দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। গ্রেফতারের আগে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
১৯৭১ সালে মার্চ মাসের প্রথমদিন থেকেই পূর্ব বাংলার স্বাধীনতাকামী মানুষ আন্দোলন-সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ে। স্বাধীনতার নেশায় বিভোর বাংলার মানুষের কাছে ২৫ মার্চ ছিল অন্যান্য দিনের মতোই। প্রতিদিনই সংঘর্ষ, হামলা ইত্যাদি ঘটনাবহুল ছিল পুরো মার্চ মাস। বাঙালিকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পাক সামরিক জান্তা প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে সান্ধ্য আইন (কারফিউ) জারি রাখে। তাই সারাদিন আন্দোলন-সংগ্রাম শেষে লড়াকুরা প্রতিদিনের মতোই বিশ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
সাধারণ অর্থাৎ ব্যাপক জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই হয় ঘুমে অচেতন, নতুবা বিছানাতে যাবার প্রস্তুতিতে ছিলেন। তারা কেউ ঘুর্ণাক্ষরেও টের পাননি সেই রাতে কি তাÐব ঘটতে যাচ্ছে, –তাদের জীবনে কি ভয়াবহ বিভীষিকা নেমে আসছে! আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী দল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাও কিছু বুঝে উঠতে পারেননি। সবারই ধারণা ছিল- পাকিস্তানিরা প্রতিবারই অস্ত্রের জোরে যেভাবে দমন-পীড়ন চালিয়েছে, তেমনই ঘটবে। অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রা হয়তো আরো বাড়বে।
কিন্ত তারা অর্থাৎ পাকিস্তানি হানাদাররা যে এইভাবে নৃশংস এবং ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞ চালাবে, সেটা কারো ভাবনাতেই আসেনি। কিন্ত পৃথিবীর সমস্ত সভ্যতা আর মানবতাকে পায়ে পিষে পাক সামরিক জান্তা সেদিন সৃষ্টি করেছিল এক কলংকিত ইতিহাস। ‘ অপারেশন সার্চলাইট’ নামে মধ্যরাতের এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহতা সেদিন দেশি-বিদেশি সাংবাদিকসহ অনেকে দেখেছেন। দেখেছেন কিভাবে তারা ঘুমন্ত এবং নিরস্ত্র মানুষের ওপর নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়েছে।
২৫ মার্চ কালোরাতে অত্যন্ত পরিকল্পিকভাবে পাক হানাদার বাহিনী তাদের হামলাগুলো চালিয়েছে। ঢাকা সেনানিবাস, পিলখানা ইপিআর সদর দপ্তর, ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রাবাস ও শিক্ষকদের বাসভবন, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ফার্ম গেইট, ধানমন্ডিসহ ঢাকার বিভিন্ন অলি-গলিতে তাদের হামলা পরিচালিত হয়। ইত্তেফাক, সংবাদ, পিপলস্ – এসব পত্রিকা অফিসে হামলা ছাড়াও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।
সেদিন যাদের তারা (পাক বাহিনী) সামনে পেয়েছে, বাজপাখীর মতোই গুলি করে মেরেছে। পুরো ঢাকা শহর ছাড়াও দেশের অনেক স্থানে তাদের সাঁজোয়া ট্যাংক, মেশিনগান, অত্যাধুনিক রাইফেলের গুলিতে এক রাতেই লুটিয়ে পরে অসংখ্য তাজা প্রাণ। একই সাথে চলেছে অগ্নি সংযোগ এবং লুটতরাজ।
পাক হানাদার বাহিনীর এই নৃশংসতায় পিচঢালা রাজপথ রক্তে ঢেকে গিয়েছিল। রক্তের হোলি খেলার সাথে পোড়া এবং বারুদের গন্ধে সৃষ্টি হয় এক ভয়ানক পরিবেশের। সেই রাতে সঠিক নিহতের সংখ্যা বা তথ্য কারো কাছেই নেই। তবে বিদেশি অনেক সংবাদ মাধ্যম নিহতের সংখ্যা এক লাখের বেশি বলে জানিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার ‘ দি সিডনি মর্নিং হেড়াল্ড’ এর ভাষ্য ছিল প্রায় একই রকম।