মাঠের বিরোধী দল বিএনপির মাঠ পর্যায়ে লন্ডভন্ড অবস্থা। মাঠ হচ্ছে তৃণমূল। সেই তৃণমূলের নেতাকর্মীরা হতাশ। আন্দোলনে ভাটার টান তারউপর সিনিয়র নেতৃত্বের নেই দেখা । জেলার নেতারা থাকেন টাউনে আন্দোলন করেন থানা ইউনিয়র পর্যায়ের নেতারা। কিন্তু ভোট আসলে মনোনয়ন পান শহুরে নেতা। কেন্দ্র নির্দেশ করে প্রার্থীকে বিজয়ী করতে। বছরের পর বছর নেই কমিটি। কমিটি হলেও কেন্দ্রের দেয়া কমিটিকে মেনে নিতে হয়। অথচ এখন সরকার পতন আন্দোলন সেই সব নেতাদের টিকিটিও পাওয়া যাচ্ছে না। দলের শীর্ষ নেতাদের সামনে এসব অভিযোগ করছেন দলের সমর্থনে নির্বাচিত সাবেক ও বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যনরা।
গত দু’সপ্তাহ ধরে বিভাগীয় পর্যায়ের জেলা গুলো থেকে এসব চেয়ারম্যানরা ধারাবাহিক ভাবে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে মতবিনিময় সভায় যোগ দিয়ে কথা বলেন। চেয়ারম্যানদের সাথে স্কাইপে যোগ দেন লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও।
গত রোববারও কুমিল্লা ও ফরিদপুর বিভাগের ইউপি চেয়ারম্যানরা যোগদিয়ে ছিলেন মতবিনিময় সভায়। তারা সরকারের পতনের জন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে আন্দোলনের ডাক দিতে বিএনপির হাইকমান্ডকে অনুরোধ জানিয়েছেন ঠিকই কিন্তু তার আগে রাগ-ক্ষোভ, বিভেদ ভুলে সবাইকে নিয়ে দল পুনর্গঠনের আহবান জানিয়েছেন তারা। তৃণমুলে যে দলের লন্ডভন্ড অবস্থার তার চিত্র পাওয়া যায় তৃণমূলের এই জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্যে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়,মতবিনিময় অনুষ্ঠানে দুই বিভাগের ২৫০ জন সাবেক ও বর্তমান চেয়ারম্যান উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে বক্তব্য দেন ৩৫ জন।
সভায় কুমিল্লার একজন ইউপি চেয়ারম্যান অভিযোগ করে বলেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সন্তুষ্ট করে যদি পদ-পদবি আর মূল্যায়ন নিশ্চিত করা যায় তাহলে তৃণমূল একসময়ে মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। কিসের ভিত্তিতে নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয় সে বিষয়ে তিনি দলের কাছে জানতে চান।
ওই ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, দলকে সংগঠিত করতে কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়, আন্দোলনের কর্মস‚চি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু জেলা পর্যায়ের নেতারা যারা বিগত দিনে দলের সুবিধাভোগী, এখনও বড় বড় পদে আছেন তাদের দেখা পাওয়া যায় না। বিগত এক যুগেও জেলার নেতাদের তার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় পাওয়া যায়নি। তার অভিযোগ, এতদিন কর্মীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর কৌশল নেওয়া হয়নি। কর্মীদের কোনো খোঁজ-খবর রাখা হয় না। কোন উপজেলাতেই নেতারা সফর করেন না। তার দাবি, এভাবে রাজনীতি হয় না।
ওই চেয়ারম্যান বলেন, শুধু জেলা শহরে এসি রুমে বসে আন্দোলন হবে না। উপজেলাতেও যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাঁরা কোথায় থাকেন, কিভাবে তাঁরা পদ পান তাও জানতে চান ওই জনপ্রতিনিধি।
চেয়ারম্যানের সুরে সুর মিলিয়ে আরও কয়েকজন বলেন, তৃণমূলকে সম্মান করুন। এবারও যদি তাদের মনে না রাখা হয় তাহলে প্রাকৃতিক নিয়মেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো দল, দেশ ও জাতি। কারণ তারা এসবের জন্য জীবনের ঝুঁকি নেয়। সেই তৃণম‚লকে নিয়ে সব জায়গাতেই বৈষম্য। এখানে কারা বক্তব্য দিতে পারবেন, কারা পারবেন না তা নিয়েও সিন্ডিকেট করা হয়। বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন শঙ্কায় তালিকায় তাদের নাম দেওয়া হয় না। তারা সবাইকে কথা বলতে দেওয়ার দাবি জানান।
সভায় জনপ্রতিনিধিরা দলের মধ্যে বিভেদ, কোন্দল ভুলে সবাইকে নিয়ে দ্রুত সময়ে আন্দোলনের ডাক দেওয়ার আহবান জানিয়েছেন।
তারা বলেন, তাদের হারানোর কিছু নেই। এবারও যদি পরিবর্তন না আসে তাহলে অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়তে হবে। কেউ বাড়ি নয়, এলাকাতেই থাকতে পারবে না। সব ধ্বংস হয়ে যাবে। গেল বছরের শেষ দিকে বিভাগীয় সমাবেশ করে আন্দোলনের যে চাঙ্গা ভাব বিএনপিতে এসেছিল, রাজপথের কর্মসূচি না থাকায় তাতে এখন ভাটা পড়েছে বলে মনে করছেন দলটির নেতাকর্মীদের অনেকেই।
তবে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের ভাষ্য, নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা বহমান। কর্মসূচি পালনে সরকারের নানান বাধার কারণে চূড়ান্ত আন্দোলনে যেতে কৌশলী হতে হচ্ছে।
প্রসঙ্গত,২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির পর রাজপথ উত্তপ্ত করতে ব্যর্থ হলেও ২০২২ সালে অনেকটা ঘুরে দাঁড়ায় বিএনপি। বিশেষ করে বছরের শেষ দিকে আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী।
১০ ডিসেম্বরে বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে সরগরম হয় রাজপথ। এই গণসমাবেশ ঘিরে গ্রেপ্তার হন বিএনপি মহাসচিবসহ দলের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা। এরপরও সেই সমাবেশে ব্যাপক নেতাকর্মীর উপস্থিতি ঘটে। ফলে মনোবল বাড়ে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের।
তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, ১০ ডিসেম্বর ঘিরে সৃষ্ট চাঙ্গা ভাব ধরে রাখতে পারেনি বিএনপির হাইকমান্ড। আন্দোলন যেখানে আরও গতি পাওয়ার কথা সেখানে ‘শীতল কর্মসূচি’ দেয়ার কারণে কর্মীরা হতাশ। এর ফলে বিএনপির আন্দোলন জোয়ার থেকে ভাটার দিকে যাচ্ছে বলেই তাদের ভাষ্য।
তবে ‘হতাশা’ মানতে নারাজ বিএনপির শীর্ষ নেতারা। তারা বলছেন, কর্মীরা হতাশ নয়, উৎসাহ ও উদ্দীপনা অব্যাহত আছে। যারা (সরকার) কথায় কথায় গুলি চালায় তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আন্দোলনে যেতে হলেতো কিছুটা কৌশলী হতেই হবে।
অপরদিকে কঠিন কর্মসূচি না দিয়ে সমাবেশসহ অবস্থান কর্মসূচির মতো নরম কর্মসূচি আসায় বিস্ময় বিএনপির মাঠের নেতাকর্মীরা। কেন্দ্রের প্রতি তাদের প্রশ্ন, হামলা-মামলায় জর্জরিত তৃণমূলের হাজার হাজার নেতাকর্মী এখন কী করবেন? আর কতদিন তারা আত্মগোপনে থাকবেন?
‘বিজয় না আসা পর্যন্ত ঘরে ফেরা নয় শ্লোগান নিয়ে যাত্রা করা আন্দোলনে ভাটা পড়ল কেন? সেই রহস্যও জানতে চান মাঠের ত্যাগী নেতাকর্মীরা।
মাঠ পর্যায়ের নেতারা বলছেন, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং বেগম খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দিদের মুক্তিসহ বিএনপি যে ১০ দাবিতে আন্দোলন করছে, এভাবে কর্মসূচি এগুতে থাকলে তা বাস্তবায়ন করা স্বপ্নই থেকে যাবে।
আন্দোলনের ধীরগতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ১৩ নং ইউনিয়ন (গোপালপুর) সভাপতি আনোয়ারুল ইসলাম নয়ন বলেন, ‘ঠান্ডা কর্মসূচি দিলেও মামলা খেতে হয়, কঠিন কর্মসূচি দিলেও মামলা খেতে হয়। গত বছর আমাদের আন্দোলনের কর্মস‚চিতে যে নেতাকর্মী ও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি লক্ষ্য করেছি যা বিগত বছরগুলোতে ছিলো না।’
এখন যদি কর্মসূচি শুধু সমাবেশ, গণঅবস্থান, মানববন্ধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে কর্মীরা আবার ঘরমুখো হবে। গেল বছরের আন্দোলনের শিখা অব্যাহত রাখা ছাড়া সরকারের কাছ থেকে দাবি আদায় করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।’
নওগাঁ সদর উপজেলার যুগ্ম আহবায়ক সারোয়ার কামাল (ইউপি চেয়ারম্যান) বলেন, দলীয় নেতাকর্মীদের আন্দোলনমুখী করতে হলে কঠিন কর্মসূচি দিতে হবে। গত বছর কর্মীরা যেভাবে পুলিশের ভীতি উপেক্ষা করে রাজপথে নেমেছে তা অব্যাহত না রাখা হয় তাহলে স্বাভাবিকভাবে তাদের মাঝে হতাশা বিরাজ করবে।’
বিএনপি নেতাকর্মীরা আর কত বছর হামলা-মামলা সহ্য করবে? এমন প্রশ্ন রেখে সারোয়ার কামাল বলেন, ‘আমাদের হাজার হাজার নেতাকর্মী আজ ঘরছাড়া। তাদের স্বাভাবিক জীবনও নেই।’
মাদারীপুর শিবচর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ইয়াজ্জেম হোসেন রোমান বলেন, ‘এটি আমাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা। যেখানে দেশের ৯৫ ভাগ মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, সেখানে আমরা কিছু করতে পারছি না।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ভিন্নমত প্রকাশ করে বলেন, ‘কর্মীরা হতাশ হচ্ছে কথাটি সঠিক নয়। তাদের ভিতর এখনো উৎসাহ উদ্দীপনা আছে।’ ‘গত বছর দলীয় যে কর্মস‚চি ছিলো তা সরকার পতনের কর্মসূচি ছিলো না। কর্মসূচি বিদ্যমান। ভবিষ্যতে আরো কঠিন কর্মসূচি আসবে, তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’ বড় দলে নেতৃত্বের নানা সংকট থাকবে। আমরা যথা সময়ে তা ঠিক করে তৃণমূলের সংকট কাটিয়ে উঠব।