# এর জন্য কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে
-অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন, অপরাধ বিশেষজ্ঞ
# অবৈধ সম্পদধারীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা
-আনিস এ খান, সাবেক চেয়ারম্যান, এবিবি
ব্রিটিশ আমলের জমিদাররা ছিলেন বেহিসাবি সম্পদের মালিক। বাৎসরিক উপার্জিত নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কারসহ মূল্যবান সম্পদ নিরাপদে গচ্ছিত রাখতে ব্যবহার করতেন লোহার সিন্দুক। সভ্যতার প্রবর্তনে এসেছে ব্যাংকিং পদ্ধতি। নিজের চেয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে টাকা-স্বর্ণ গচ্ছিত রাখা অতীব নিরাপদ মনে করে মানুষ। কিন্তু, এই আধুনিক যুগেও যদি কেউ সনাতনি সিন্দুকে নির্ভর করে, সেটিকে কেউ কেউ জমিদারি ঐতিহ্য ধরে রাখার মানসিকতা মনে করতে পারে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। হাতের মুঠোয় থাকা আধুনিক ব্যাংকিং সুবিধা বাদ দিয়ে ঘরের মধ্যে সিন্দুকে অর্থ লুকিয়ে রাখার পদ্ধতির অন্যতম, সম্পদের বৈধতা।
ইতোপূর্বে এমন নজির দেখা গেছে যে, অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ ব্যাংকে রাখতে গেলে রাষ্ট্র জেনে যায়। পড়তে হয় বেকায়দায়। তাই, ঘরের মধ্যে সিন্দুক বানিয়ে সেই অর্থ লুকিয়ে রাখেন দুর্নীতিবাজেরা। বিশেষ করে ২০১৯ সালে দেশব্যাপী ক্যাসিনোসহ জুয়া, মাদক ও দুর্নীতিবাজ বিরোধী বিশেষ অভিযানের সময় সিন্দুকে টাকা জমানো অনেকের মুখোশ উন্মোচন হয়।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি লোহার সিন্দুক কেনা-বেচা ও ব্যবহার বেড়েছে। তবে ব্যবহারের ধরন পাল্টে গেছে। কালো টাকার মালিকরা অবৈধভাবে অর্থবিত্ত অর্জন করছেন এবং ব্যাংকে প্রদর্শনের মতো প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট নেই, তারাই এখন বাসা-বাড়িতে লোহার সিন্দুকে লুকিয়ে রাখছেন কালো টাকা। গত তিন বছর আগে দেশে যখন ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চালানো হয়, তখন ঘরে ঘরে নগদ টাকা মিলেছে সিন্দুকে ও বালিশ-তোশকের নিচে। গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র মতে মিলে এ সব তথ্য।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবৈধ উৎস থেকে উপার্জিত অর্থ নিরাপদে রাখতে চাওয়ার কারণেই ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বেড়ে চলেছে। দুর্নীতি ও অবৈধভাবে অর্জিত কালো টাকা ব্যাংকিং খাতে আসছে না। আবার বড় বড় কেলেঙ্কারির কারণে ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থা কমে আসায় রাজধানীসহ সারা দেশে সিন্দুক বিক্রি বেড়ে গেছে। দুর্নীতিবাজরা ব্যাংকে টাকা না রেখে সিন্দুকে রাখছে। সেই টাকা ব্যবহার করছে অবৈধ অর্থ হুন্ডির কাজে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অবৈধ সম্পদ অর্জনকারীরা টাকা লুকিয়ে রাখতে এখন সিন্দুকের ব্যবহার করছে। বাসা-বাড়ির মধ্যে মাটির নিচে আলাদা সুরঙ্গ তৈরি করে সেখানে সিন্দুকে টাকা লুকিয়ে রাখছে। এ ব্যাপারে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান বলেন, ব্যাংকের বাইরে থাকা অর্থের বড় অংশই কালো টাকা। অবৈধভাবে অর্জিত এ অর্থ অপরাধীরা ব্যাংকে রাখতে সাহস পাচ্ছে না। ফলে এ অর্থের একটি অংশ হুন্ডির কাজে ব্যবহার হচ্ছে, অন্য অংশ বাড়িতে সিন্দুকে লুকিয়ে রাখছে। অবৈধ সম্পদধারীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। এই পদক্ষেপ দুর্নীতি দমন কমিশনকে নিতে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুরান ঢাকার সিক্কাটোলি, যাত্রাবাড়ীর কাজলা, ভাঙ্গা প্রেস এলাকা ও স্বামীবাগ রেলগেট এলাকার কারখানায় তৈরি হয় সিন্দুক। এছাড়াও রাজধানীর বাইরে ভৈরবের রানীবাজার ও খুলনা থেকেও উন্নতমানের সিন্দুক এনে ঢাকার বিক্রি করা হচ্ছে। তবে রাজধানীর মালিটোলা, বংশালে হাসান মেটালের দুটি, জুয়েল মেটাল, শাবনাজ স্টিল কিং ও ডিজিটাল লকার হাউজ শুধু সিন্দুক বা লকার বিক্রি করছে। তবে আগের চেয়ে বিক্রি ও কদর বাড়ছে।
এ ব্যাপারে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, অবৈধভাবে আয় করা টাকা ব্যাংকে না রেখে বাসা-বাড়িতে লকারে লুকিয়ে রাখছে অসাধু ব্যক্তিরা। তাই তারা বেচে নিচ্ছে সিন্দুক কিংবা লকার। বংশালে হাসান মেটালের মালিক আমিনুল হোসেন বলেন, ক্রেতার অর্ডার অনুযায়ী তারা সিন্দুক তৈরি করেন। সিন্দুক বিক্রির কোনও মৌসুম নেই। সাধারণত সোনা ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন এজেন্ট ব্যাংক তাদের কাছ থেকে সিন্দুক কেনে। বর্তমানে সাধারণ মানুষও বাসা-বাড়িতে সিন্দুক ব্যবহার শুরু করেছে।
এ ব্যাপারে জুয়েল মেটালের পরিচালক রিয়াজ মাহমুদ বলেন, গত ৪০ বছর ধরে আমরা ব্যবসা করছি। সবসময়ই লকার, সিন্দুক বিক্রি হয়। ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ সবাই কিনছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় বিক্রি বেড়েছে দ্বিগুন। পাঁচ হাজার টাকা থেকে লাখ টাকার বেশি দামের সিন্দুক রয়েছে। প্রতিদিন কম বেশি বিক্রি হচ্ছে সিন্দুক। শাবনাজ স্টিলের পরিচালক ফারুক হোসেন বলেন, আগে সোনা ব্যবসায়ী ও ব্যাংকগুলো লকার ব্যবহার করতো। বর্তমানে সাধারণ মানুষও বাসা-বাড়িতে নিজেদের মূল্যবান সম্পদ নিরাপদে রাখতে সিন্দুক বা লকার ব্যবহার করছে। ডিজিটাল লকার হাউজের মালিক মনির হোসেন বলেন, দোকানিদের অর্ডার অনুযায়ী তারা লকার তৈরি করে সাপ্লাই দেন। ক্রেতার কাছ থেকে সরাসরি কোনও অর্ডার তারা পান না। মাসে ৮-১০টা লকার তৈরি করা সম্ভব হয়। একটি লকার তৈরিতে ৩-৪ দিন সময় লাগে। বড় হলে আরও বেশি সময় লাগে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিক্কাটোলি ইসলাম স্টিলের মালিক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ীরা সিন্দুক বা লকার বিক্রি করি। অর্ডার দিলে আমরা তৈরি করে দিই।’ এরপর ক্রেতা কী কাজে সেটি ব্যবহার করবেন, কোথায় নিয়ে যাবেন, তা তাদের দেখার বিষয় নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। সূত্র বলছে, গত তিন বছর আগে গেণ্ডারিয়া, ওয়ারী এবং সূত্রাপুরে অভিযান চালিয়ে র্যাব এনু-রুপনের বাসা থেকে ৫ কোটি ৫ লাখ ৯৪২ হাজার ১০০ টাকা ও সাড়ে ৮ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়াও বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও বিদেশী বিভিন্ন মুদ্রা পাওয়া গেছে যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট, খালেদ, জিকে শামীমের বাড়ি থেকেও। তখন থেকেই কালো টাকার মালিকদের বাড়ি, ফ্ল্যাট ও বিভিন্ন জায়গায় রাখা টাকার সিন্দুকের খোঁজে অভিযান অব্যাহত রেখেছে র্যাব।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষমতাসীন দলের তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের নেতাদের বাড়ি ও অফিস থেকে যে পরিমাণ নগদ টাকা পাওয়া হচ্ছে, সেটি বিস্ময়কর। অর্থনীতিতে কালো টাকার দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অবৈধ উপায়ে অর্জিত এ অর্থ ব্যাংকে না গিয়ে বিদেশে হুন্ডির কাজে ব্যবহার হচ্ছে কিংবা সিন্দুকে আশ্রয় নিচ্ছে। ফলে ব্যাংকিং খাতের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ দিনদিন বেড়েই চলছে।
এ ব্যাপারে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, অবৈধ সম্পদ অর্জনকারীদের গ্রেপ্তার করলেই চলবে না। তাদের শারীরিক শাস্তি এবং সম্পদ কেড়ে নেয়ার শাস্তি একই সঙ্গে প্রয়োগ করতে হবে। না হলে অপরাধীরা আইনে ফাক গলিয়ে বেড়িয়ে যাবে। কালোটাকার মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।