রোদ ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে জুলুসে জনস্রোত
চট্টগ্রামে ৫৫তম ঐতিহাসিক জশনে জুলুসে লাখো আশেকে রাসুলের ঢল, শান্তি ও সুন্নাহর বার্তায় বিশ্বশান্তির আহ্বান পীর আল্লামা সাবির শাহের
‘আল্লাহু আল্লাহু তুমি জাল্লে জালালুহু, / শেষ করা তো যায় না গেয়ে তোমার গুণগান…’ কিংবা ‘মুস্তফা জানে রাহমাত পে লাখো সালাম, / শাময়ে বযমে হেদায়াত পে লাখো সালাম…’—হৃদয়ছোঁয়া এসব হামদ, নাত, দরুদ শরিফ ও তাকবিরের ধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো বন্দরনগরী। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শুভ আগমনী দিন পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে চট্টগ্রামে আয়োজিত হয়েছে ঐতিহাসিক জশনে জুলুস। প্রখর রোদ আর আকস্মিক বৃষ্টি উপেক্ষা করে দেশের দূরদূরান্ত থেকে আসা লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষের উপস্থিতিতে গোটা নগরী যেন রূপ নিয়েছিল এক সুবিশাল জনসমুদ্রে।
আজ বুধবার (২৬ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে নগরীর ষোলশহরের জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন আলমগীর খানকা-এ কাদেরিয়া সৈয়্যদিয়া থেকে বের হয় দেশের অন্যতম বৃহৎ এই ধর্মীয় শোভাযাত্রা। ১৯৭৪ সালে আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রহ.) কর্তৃক প্রবর্তিত এই আয়োজনের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে আনজুমান-এ-রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট। ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজনের এবার ছিল ৫৫তম আসর।
পাকিস্তানের দরবারে সিরিকোটের সাজ্জাদানশীন পীর আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ -এর নেতৃত্বে বের হওয়া এই জুলুসে অতিথি হিসেবে সঙ্গে ছিলেন সাহেবজাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ কাসেম শাহ ও শাহজাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ আকিব আহমেদ শাহ ।
জুলুসে অংশ নিতে ভোর থেকেই চট্টগ্রাম নগরী, জেলার বিভিন্ন উপজেলা এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আশেকে রাসুলেরা ষোলশহরে জড়ো হতে শুরু করেন। কেউ হেঁটে, আবার কেউ বাস, ট্রাক, পিকআপ ও মোটরসাইকেলে চড়ে নগরীতে আসেন। প্রখর রোদ উপেক্ষা করে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের উপস্থিতি বহুগুণ বেড়ে যায়। ষোলশহর থেকে শুরু হয়ে বিবিরহাট, মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট, জিইসি মোড়, ওয়াসা, লালখান বাজার হয়ে জুলুস পৌঁছায় টাইগারপাসে।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শোভাযাত্রাটি যখন টাইগারপাস মোড় অতিক্রম করছিল, ঠিক তখন আকাশ মেঘে ঢেকে যায় এবং ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হয়। চরম আবেগ ও ভক্তিতে বৃষ্টিতে ভিজেই লাখো মানুষ হুজুর কেবলার গাড়ি অনুসরণ করে সামনে এগিয়ে যান। পরে একই পথ ঘুরে জুলুস আবার জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসা মাঠে এসে শেষ হয়।
দীর্ঘ এই পথে জুলুসে অংশগ্রহণকারী এবং পথচারীদের মাঝে প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি, শরবত, শুকনা খাবার, কলা, খেজুর ও বিরিয়ানি বিতরণ করতে দেখা যায়। এক মাস ধরে নগরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়, সড়ক বিভাজক ও প্রধান সড়কগুলো সবুজ পতাকা, তোরণ, ব্যানার ও ফেস্টুন দিয়ে সুসজ্জিত করায় পুরো চট্টগ্রাম রূপ নেয় এক উৎসবের নগরীতে।
জুলুস শুরুর আগে সকাল ৯টায় আলমগীর খানকা শরীফে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধান অতিথি পীর আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ বক্তব্যে ইসলামের মূল চেতনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ নিশ্চিহ্ন করে শান্তি প্রতিষ্ঠাই রাসুলুল্লাহর (সা.) প্রকৃত আদর্শ। সমগ্র সৃষ্টির জন্য আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নিয়ামত ও রহমত হিসেবে তাঁর শুভাগমন জাহেলিয়াতের অন্ধকার দূর করে সমাজকে আলোকিত করেছে, বর্বর জাতিকে করেছে সভ্য এবং অবহেলিত নারী ও মানবজাতিকে দিয়েছে তাদের ন্যায্য অধিকার।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আল্লাহর এই মহান নিয়ামত লাভের পর আনন্দ প্রকাশ করা স্বয়ং কোরআনের নির্দেশ। তাই জশনে জুলুস কেবল একটি উৎসব নয়, এটি রাসুলপ্রেমের পরম বহিঃপ্রকাশ।’ সংবাদ সম্মেলন শেষে তিনি বিশ্বশান্তি ও মানবতার জন্য বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন।
পরবর্তীতে জুলুস শেষে জামেয়া মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত মাহফিলে আল্লামা সাবির শাহ যুক্ত করেন, ‘কোরআন তেলাওয়াত, নাতে রাসুল পাঠ ও সীরাত আলোচনার মাধ্যমে আমরা মহানবীর জীবন-আদর্শ ধারণ করি।’
অনুষ্ঠানে আনজুমান ট্রাস্টের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মনজুর আলম মনজু বলেন, ‘জশনে জুলুসের মূল বার্তা হলো শান্তি, মানবতা, অহিংসা এবং প্রিয়নবী (সা.)-এর সুন্নাহ ও আদর্শকে জীবনে ধারণ করা।’
আনজুমানের মুখপাত্র অ্যাডভোকেট মোছাহেব উদ্দিন বখতেয়ার এবং ক্যাবিনেট মেম্বার পেয়ার মোহাম্মদ বলেন, ১৯৭৪ সালে বলুয়ার দীঘি থেকে শুরু হওয়া প্রথম জুলুসে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল হাজারের কম। আজ সেখানে অর্ধকোটির কাছাকাছি মানুষের সংযোগ ঘটছে। শরিয়তের পবিত্রতা রক্ষা করে বিশ্বকে ইসলামের শান্তির বার্তা দেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য।
.ঐতিহাসিক এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পুরো নগরজুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা ও কঠোর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী এ প্রসঙ্গে জানান, জশনে জুলুসের মতো সুবিশাল মহাসমাবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের প্রধান দায়িত্ব।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আনজুমান-এ-রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের প্রায় ১০ হাজার প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক পুরো জুলুসের শৃঙ্খলা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও দূরদূরান্ত থেকে আসা মুসল্লিদের সুবিধার্থে মাদ্রাসা ও আশপাশের এলাকায় শতাধিক অস্থায়ী শৌচাগার স্থাপন করা হয়।
মাহফিলে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আনজুমান ট্রাস্টের সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনসহ গাউসিয়া কমিটির শীর্ষ নেতারা।
মাহফিল শেষে উপস্থিত লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণে জোহরের নামাজ আদায় করা হয়। পরিশেষে দেশ, জাতি এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও ঐক্য কামনায় বিশেষ আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় ঐতিহাসিক এই ৫৫তম জশনে জুলুস।