রেলওয়ের দুর্নীতির প্রতীক মোঃ রমজান আলী:

শত কোটি টাকার অনিয়ম, অবৈধ সম্পদ ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিস্ফোরক অনুসন্ধান

বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী (পশ্চিম) মোঃ রমজান আলীকে ঘিরে উঠে এসেছে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিস্তৃত অভিযোগ। সরকারি চাকরি থেকে অপসারণ হওয়া এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগসহ একাধিক মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে তার কর্মকাণ্ডের এক বিস্ময়কর চিত্র, যা দীর্ঘদিন ধরে রেলওয়ের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে আসছে।
শত কোটি টাকার কাজ বিনা টেন্ডারে অভিযোগ রয়েছে, রাজশাহীতে প্রধান প্রকৌশলী (পশ্চিম) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মোঃ রমজান আলী নিয়মবহির্ভূতভাবে খোলামেলা টেন্ডার প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে খঞ্জগ (খরচ জরুরি কাজ) পদ্ধতির অপব্যবহার করে নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের কয়েকশ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেন। সূত্র মতে, নভেম্বর ২০১৬ থেকে ডিসেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত সময়ে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার কাজ টেন্ডার ছাড়াই অনুমোদন দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রায় ১০ শতাংশ কমিশন গ্রহণ করা হতো। কিন্তু বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের পরও রেললাইনে দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি। ফলে রেলওয়ের অভ্যন্তরে এবং বাইরে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। ঠিকাদারদের অনেক বিল দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকার অভিযোগও রয়েছে।

ট্রেনের গতি বাড়িয়ে বিপর্যয়
সমালোচনা থেকে বাঁচতে তিনি জয়দেবপুর–পার্বতীপুর সেকশনে ট্রেনের গতি ৯০ কিলোমিটার থেকে ১০০ কিলোমিটার করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু রেললাইনের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে ব্যাপকভাবে কংক্রিট স্লিপার ভাঙা এবং রেল ব্রোকেনের ঘটনা ঘটতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ মার্চ ২০২৬ সালে সান্তাহার সেকশনে রেল ব্রোকেনের ঘটনায় নীলসাগর এক্সপ্রেস দুর্ঘটনার মুখে পড়ে, যার ফলে প্রায় ২১ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। এ ঘটনায় রেলওয়ের অবকাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।

অবৈধ সম্পদের পাহাড়
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে রমজান আলীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠে আসে। মামলায় তার নামে ২ কোটি ৪৩ লাখ ৮০ হাজার ২৮৬ টাকা এবং তার স্ত্রী দিলরুবা পারভিনের নামে ২ কোটি ৪৭ লাখ ৯০ হাজার ৬৫৬ টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ আনা হয়।
এ অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে আখাউড়া–লাকসাম রেল প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পদ থেকে প্রত্যাহার করে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।

বসুন্ধরায় বহুতল বাড়ি
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এইচ ব্লকের ৬ নম্বর রোডের ৪৮৭ নম্বর প্লটে তিন কাঠা জমির ওপর তিনি একটি আটতলা বাড়ি নির্মাণ করেন, যার প্রতিটি ফ্লোর প্রায় দেড় হাজার বর্গফুট। বাড়িটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
এছাড়া তার নামে একটি প্রাইভেট কার (নম্বর: ঢাকা মেট্রো ঘ-২৯-৩৪৮২) কেনা এবং নগদ অর্থসহ প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩৬ টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে, যা তার বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যাংকে সন্দেহজনক লেনদেন
তদন্তে আরও জানা যায়, তিনি বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামে অর্থ জমা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংকেএবং ব্র্যাক ব্যাংকে।  তার বিরুদ্ধে দুদক আইন ২০০৪ এর ২৭(১) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ৮(২) ও ৮(৩) ধারায় মামলা করা হয়েছে।

স্ত্রীদের নামেও সম্পত্তি
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, নিজের পাশাপাশি স্ত্রী দিলরুবা পারভিনের নামেও বিপুল সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেবসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্পে ৩৩০৭ নম্বর প্লটে তিন কাঠা জমি, বসুন্ধরার আরেক প্রকল্পে ১০৮০ নম্বর প্লটে তিন কাঠা জমি, জামালপুরের সিংজনি মৌজায় জমি ও পাঁচতলা আবাসিক ভবন
পাবনায় প্রায় ২১ শতাংশ জমি। এসব সম্পদের কিছু অংশ আদালতের নির্দেশে ক্রোক করা হলেও তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেও প্রকাশ্যে চলাফেরা
অভিযোগ রয়েছে, তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও তিনি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসে প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে, রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মামলার কার্যক্রম বিলম্বিত করে আসছেন।

মামলা বিলম্বে কৌশল
তদন্তে আরও অভিযোগ ওঠে, তিনি এবং তার স্ত্রী অসুস্থতার ভুয়া প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে বারবার সময় নেন এবং আদালতের কার্যক্রম বিলম্বিত করার চেষ্টা করেন। এমনকি তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও মামলা দায়েরের চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিতর্কিত ব্যক্তিজীবন
রমজান আলীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। অনুসন্ধানে জানা যায়, তিনি একাধিক বিয়ের পাশাপাশি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে বিতর্কে জড়িয়েছেন। রাজশাহীর বহরামপুর এলাকার শোভা খাতুন নামে এক নারীর সঙ্গে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সামাজিক চাপে তাকে বিয়ে করতে হয় বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। পরবর্তীতে ভরণপোষণ না দেওয়ায় ওই নারী রাজশাহী আদালতে মামলা করেন, যা এখনো বিচারাধীন।

রেস্ট হাউজ ব্যবহারের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, তিনি ব্যক্তিগত ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য বিভিন্ন সময় সরকারি রেলওয়ে রেস্ট হাউজ—বিশেষ করে রাজশাহী ও খুলনা রেস্ট হাউজ ব্যবহার করতেন।

চাকরি থেকে অপসারণ
দুর্নীতির অভিযোগে অবশেষে তাকে সরকারি চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে বরখাস্ত করা হয়।
কিন্তু চাকরি হারানোর পরও তাকে যমুনা রেল সেতু প্রকল্প এবং মেট্রোরেল প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে সেখানে তার অদক্ষতা ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

অভিযোগের বন্যা ও কর্মকর্তাদের হয়রানি
রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, রমজান আলী চাকরি জীবনের শুরু থেকেই বিভিন্ন সংস্থা—দুদক, ডিজিএফআই, এনএসআইসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর এবং গণমাধ্যমে সহকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ পাঠিয়ে হয়রানি করার চেষ্টা করতেন। রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, তার বিরুদ্ধে থাকা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করে আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের ঘটনা রেলওয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করবে। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শত কোটি টাকার অনিয়ম, অবৈধ সম্পদ এবং বহুমুখী অভিযোগে অভিযুক্ত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর দ্রুত ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি এখন সময়ের দাবি।