বাংলাদেশ রেলওয়ের  উন্নয়ন ও অবকাঠামো বিভাগে নতুন দায়িত্ব, চট্টগ্রাম পূর্বাঞ্চলেও নেতৃত্বে পরিবর্তন

বাংলাদেশ রেলওয়ের শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল করা হয়েছে। সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পদে একযোগে দায়িত্ব পরিবর্তনের ফলে রেলভবনের উন্নয়ন ও অবকাঠামো বিভাগ এবং চট্টগ্রাম পূর্বাঞ্চলের প্রশাসনিক নেতৃত্বে নতুন বিন্যাস তৈরি হয়েছে। চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন, অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা এবং রেল পরিচালনায় এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) (চলতি দায়িত্ব) মামুনুল ইসলাম, পিইঞ্জকে চট্টগ্রাম পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। এতদিন চট্টগ্রাম পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মো. সুবক্তগীণকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) (চলতি দায়িত্ব) পদে আনা হয়েছে।

অন্যদিকে, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) (চলতি দায়িত্ব) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁকে যমুনা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।

রেলওয়ের প্রশাসনিক কাঠামোয় এই তিনটি পদই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে একসঙ্গে তিন পদে পরিবর্তনকে নিছক নিয়মিত বদলি-পদায়ন হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে উন্নয়ন ও অবকাঠামো বিভাগের দায়িত্বের পরিবর্তনকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উন্নয়ন প্রকল্পে নতুন নেতৃত্ব

বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়ন কার্যক্রমের বড় অংশই নির্ভর করে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) কার্যালয়ের ওপর। নতুন রেলপথ নির্মাণ, বিদ্যমান রেলপথের সক্ষমতা বাড়ানো, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা, প্রকল্প বাস্তবায়নে আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই এ বিভাগের ভূমিকা রয়েছে।

আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান নতুন দায়িত্বে এসব কার্যক্রমের সমন্বয় করবেন। একই সঙ্গে যমুনা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পাওয়ায় তাঁর দায়িত্বের পরিধি আরও বেড়েছে।

দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর রেল যোগাযোগের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে যমুনা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের গুরুত্ব রয়েছে। তাই প্রকল্পটির অগ্রগতি, অবকাঠামোগত কাজের সমন্বয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ এগিয়ে নেওয়া নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হবে।

 অবকাঠামো বিভাগেও পরিবর্তন

চট্টগ্রাম পূর্বাঞ্চলের জিএমের দায়িত্ব থেকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) পদে আসছেন মো. সুবক্তগীণ। মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার তাঁকে রেলভবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিভাগ সামলাতে হবে।

রেলওয়ের অবকাঠামো বিভাগ দেশের রেলপথ, সেতু, স্টেশনসহ বিভিন্ন স্থাপনা ও অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। পুরোনো রেলপথ সংস্কার, সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন অবকাঠামো নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ বিভাগের কাজের সঙ্গে যুক্ত।

ফলে নতুন দায়িত্বে সুবক্তগীণের সামনে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হবে চলমান কাজের গতি ধরে রাখা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার সমন্বয় করা।

 চট্টগ্রাম পূর্বাঞ্চলে নতুন জিএম

রেলওয়ের পরিচালন ব্যবস্থায় চট্টগ্রাম পূর্বাঞ্চলের গুরুত্ব আলাদা। দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে বিপুল সংখ্যক যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালিত হয় এ অঞ্চলে। ফলে এ অঞ্চলের ট্রেন পরিচালনা, রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা, জনবল ব্যবস্থাপনা ও যাত্রীসেবার সঙ্গে জিএমের দায়িত্ব সরাসরি সম্পর্কিত।

মামুনুল ইসলাম, পিইঞ্জ এতদিন উন্নয়ন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। এবার মাঠপর্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বগুলোর একটি তাঁর ওপর অর্পিত হলো।

নতুন দায়িত্বে তাঁকে পরিচালন ব্যবস্থার পাশাপাশি রেলপথ ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা, যাত্রীসেবার মান এবং আঞ্চলিক পর্যায়ের বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে।

 একই সময়ে তিন পদে পরিবর্তনের তাৎপর্য

রেলওয়ের উন্নয়ন কার্যক্রম বর্তমানে বড় পরিসরে বিস্তৃত। একদিকে নতুন রেলপথ ও অবকাঠামো নির্মাণ চলছে, অন্যদিকে পুরোনো অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনও বাড়ছে। একই সঙ্গে রেল পরিচালনায় দক্ষতা ও যাত্রীসেবার মান উন্নয়নের চাপ রয়েছে।

এই বাস্তবতায় উন্নয়ন, অবকাঠামো ও একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলাঞ্চলের শীর্ষ পদে একযোগে পরিবর্তন প্রশাসনিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব গ্রহণের পর চলমান প্রকল্প ও পরিচালন ব্যবস্থায় কোনো নীতিগত বা প্রশাসনিক পরিবর্তন আসে কি না, সেটিও এখন দেখার বিষয়।

 সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

রেলওয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ রোধ, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, অবকাঠামোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপদ ট্রেন পরিচালনা এবং যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দ্রুত আধুনিক ও সক্ষম রেল যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যাশা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কর্মকর্তা পরিবর্তন করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে দক্ষতা, আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয়, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব সমস্যা দ্রুত সমাধানের ওপরই নির্ভর করবে এই পরিবর্তনের কার্যকারিতা।

রেলওয়ের শীর্ষ পর্যায়ের এই রদবদলের ফলে দায়িত্বপ্রাপ্ত তিন কর্মকর্তা এখন নিজ নিজ ক্ষেত্রে কতটা গতি আনতে পারেন, সেটিই হবে মূল বিষয়। বিশেষ করে উন্নয়ন ও অবকাঠামো বিভাগের কাজের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের পরিচালন ব্যবস্থার সমন্বয় কতটা কার্যকর হয়, তার ওপর রেলওয়ের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধির অনেকটাই নির্ভর করবে।