তিতাসের বুকে ফের নৌকাবাইচ, নদীপাড়ে লাখো মানুষের ঢল

কর্তালের টুংটাং ছন্দের তালে তিতাসের বুকে একসঙ্গে বৈঠা চালাচ্ছেন সত্তর জোড়া হাত। পেছনে দাঁড়িয়ে সেই হাতকে আরও শক্তি জোগাচ্ছেন বাইচাল প্রধান। নদীর দুই ধারে দাঁড়িয়ে টানটান উত্তেজনায় লাখো সমর্থক। এই আনন্দ শুধু উল্লাসের নয়, সম্মান ও ঐতিহ্যেরও। চূড়ান্ত ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষা—কে হবেন বিজয়ী, কোন নৌকার বাইচালদের ঘরে যাবে প্রথম পুরস্কার?
দুই বছর পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীতে এমনই উৎসবমুখর নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকালে ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিযোগিতাকে ঘিরে তিতাসের দুই তীরে নামে মানুষের ঢল। দুপুরের পর থেকেই নদীপাড়ে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে। প্রতিযোগিতা শুরু হলে শিমরাইলকান্দি থেকে মেড্ডা পর্যন্ত নদীর দুই তীর লোকারণ্য হয়ে ওঠে।
বিকাল সাড়ে ৩টায় প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এতে জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ৯টি নৌকা অংশ নেয়। প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে সদর উপজেলার ক্ষমতাপুর গ্রামের শাপলা বয়েজ ক্লাবের নৌকা।
২০২৩ সালে সবশেষ তিতাস নদীতে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এ আয়োজন করা হয়নি। দীর্ঘ বিরতির পর এবার আবার নৌকাবাইচ হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়।
নৌকাবাইচ দেখতে আসা কুয়েতপ্রবাসী মহসিন পারভেজ বলেন, ‘এবার বাড়ি ফিরে এমন আয়োজন দেখে খুবই ভালো লাগল। যুবসমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখতে এ ধরনের আয়োজনের কোনো বিকল্প নেই। অনেক দূরদূরান্তের মানুষকে নৌকাবাইচ দেখতে আসতে দেখলাম।’
আরেক দর্শনার্থী হাসান সাফায়াত বলেন, ‘দুই বছর বন্ধ থাকার পর এবার তিতাসের বুকে নৌকাবাইচ হওয়ায় এখানকার অনেক মানুষই আবেগাপ্লুত হয়েছেন। ঢাকা থেকে এসেও এই বিশাল আয়োজন স্বচক্ষে দেখতে পেরে মনে হচ্ছে, যাত্রাটা ভুল হয়নি। আশা করব, এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।’
তবে উৎসবের এই আয়োজনের মধ্যেও তিতাসের নাব্যতা হারানোর বিষয়টি সামনে এসেছে। নদী ও প্রকৃতি সুরক্ষা সামাজিক আন্দোলন তরী বাংলাদেশের আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন, ঐতিহাসিক তিতাস দখল ও দূষণসহ নানা কারণে ধীরে ধীরে নাব্যতা হারাচ্ছে। ‘এই তিতাস আমাদের অস্তিত্বের অংশ। এটা নিয়ে সবাইকে ভাবতে হবে, তিতাসকে বাঁচাতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘তরী বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে তিতাসের দখল-দূষণ নিয়ে কাজ করে আসছে। তিতাসে নৌকাবাইচের মতো আয়োজন খুবই জরুরি। এর ফলে মানুষ নদীর কাছে আসবে, নদীর কথা ভাববে।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, ‘নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা এখানকার মানুষের প্রাণের উৎসব। আগামী বছর থেকে আরও বড় পরিসরে জমজমাটভাবে এ প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হবে।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য খালেদ হোসেন মাহবুব বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং এখানকার সংস্কৃতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে অনেকেই নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে। এই নৌকাবাইচের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এখনও অটুট আছে।’
তিনি বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংস্কৃতিক চর্চার উপযোগী পরিবেশ রয়েছে। এখানকার মানুষ প্রতিবছর নৌকাবাইচের মতো আয়োজন নিয়মিত দেখতে চায়। সামনের দিনগুলোতে এ ধরনের আরও আয়োজন হবে বলে আশা করেন তিনি।
পরে প্রতিযোগিতায় বিজয়ী দলের হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হয়। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক শরিফুল ইসলাম, পুলিশ সুপার শাহ মো. আব্দুর রউফ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রঞ্জন চন্দ্র দে, জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মোবারক হোসেন, জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি জহিরুল হক খোকন ও সাবেক সভাপতি হাফিজুর রহমান মোল্লা কচিসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।