রেলের একটি ক্রয় কার্যক্রম নিয়ে ৩০০ কোটি টাকা এবং ঠিকাদার নির্বাচনের যে অভিযোগ সামনে এসেছে, তার সঙ্গে বাস্তব ক্রয় প্রক্রিয়ার কোনো মিল নেই বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট মহল। এখন পর্যন্ত এ সংক্রান্ত কোনো ক্রয় নথিই অগ্রায়ন করা হয়নি। ফলে ঠিকাদার নির্বাচন, দরপত্র অনুমোদন, চুক্তি সম্পাদন কিংবা বিল পরিশোধের মতো প্রশ্নই এ পর্যায়ে ওঠে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার একটি নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা রয়েছে। প্রথমে ক্রয় সংক্রান্ত নথি প্রক্রিয়াকরণ ও অনুমোদনের পর্যায় অতিক্রম করতে হয়। এরপর দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন ও অনুমোদনের বিষয় আসে। দরপত্র অনুমোদনের পরই কেবল চুক্তি সম্পাদনের প্রশ্ন আসে এবং কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর বিল পরিশোধের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
অথচ যে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ক্রয় নথিই অগ্রায়ন হয়নি, সেই বিষয়কে কেন্দ্র করে ঠিকাদার নির্বাচন কিংবা ৩০০ কোটি টাকার ক্রয়ের অভিযোগ তোলা কতটা যৌক্তিক—এ নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, *‘নথিই যদি অগ্রায়ন না হয়ে থাকে, তাহলে দরপত্র অনুমোদন হলো কীভাবে? দরপত্র অনুমোদন না হলে চুক্তি হলো কীভাবে? আর চুক্তিই না হলে বিল পাশ বা পরিশোধের প্রশ্ন আসে কোথা থেকে?’
ক্রয় প্রক্রিয়া এগোয়নি, তাহলে ঠিকাদার নির্বাচনের অভিযোগ কেন?
সংশ্লিষ্টদের দাবি, যে ক্রয় কার্যক্রমটি নিয়েই এত আলোচনা, সেটি বাস্তবে এগোয়নি; । এ অবস্থায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ঠিকাদার হিসেবে নির্বাচনের অভিযোগকে তারা ‘বাস্তবতাবিবর্জিত বলে অভিহিত করেছেন।
চলতি অর্থবছরে সিওএস/পশ্চিম, সিওএস/পূর্ব ও সিসিএস পাহাড়তলী, এই ৩ দপ্তরের মোট বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২২৩ কোটি টাকা। এই টাকার ৪০% ব্যয় হয় ইঞ্জিনে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের লুবওয়েল ক্রয়ে। এছাড়া বিদেশ হতে আমদানীকৃত বিভিন্ন বিদেশি মালামাল বন্দর হতে খালাস করতে প্রায় ২০% টাকা সিডি ভ্যাট বাবদ ব্যয় হয়। আর অবশিষ্ট টাকা দিয়ে এলসি করে বিদেশ হতে মালামাল আমদানিতে এবং কিছু টাকা দিয়ে এনসিটি টেন্ডারের মাধ্যমে মালামালের ক্রয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। কাজেই যেখানে বরাদ্দ ই ২০০ কোটি টাকার মত, সেখানে ৩০০ কোটি টাকার লুটপাটের মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হলুদ সাংবাদিকতা ছাড়া আর কিছুই না। তাছাড়া লুব ওয়েল ও বিদেশি মালামালের এল সি করতে ও বন্দর হতে মালামাল খালাসে বরাদ্দকৃত অর্থের প্রায় ৬০-৭০% ব্যয় হয়। সেখানে কোন সঠিক তথ্য না নিয়ে হলুদ সাংবাদিকদের তথ্যের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবী। কারণ ষড়যন্ত্রকারীদের এই মিথ্যা অপ প্রচারের ফলে একটা প্রতিষ্ঠানের যেমন সুনাম ক্ষুন্ন হয়, তেমনি যারা রেলের জন্য নিবেদিত প্রাণ হয়ে, আন্তরিকভাবে কাজ করতে চান, তাদের কাজ করার আগ্রহে ভাট পড়ে। এতে প্রকারান্তরে প্রতিষ্ঠানই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের মতে, কোনো সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে ঠিকাদার নির্বাচন একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়ে থাকে। সেখানে নথিপত্র, দরপত্র, মূল্যায়ন, অনুমোদন ও চুক্তিসহ একাধিক ধাপ রয়েছে। এসবের কোনো ধাপই সম্পন্ন না হলে ঠিকাদার নির্বাচনের দাবি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ।
রেলকে বিতর্কিত রাখার অপচেষ্টা?
সংশ্লিষ্ট মহল অভিযোগ করেছে, একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই রেলওয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। তাদের দাবি, রেলের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন ইস্যু সামনে এনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, রেলের কোনো কার্যক্রম নিয়ে বাস্তব ও নথিভিত্তিক প্রশ্ন থাকলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় উত্থাপন করা যেতে পারে। কিন্তু কোনো কার্যক্রমের প্রাথমিক নথিই যেখানে এগোয়নি, সেখানে কোটি কোটি টাকার ক্রয় ও ঠিকাদার নির্বাচনের অভিযোগ সামনে আনা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না—সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ডিজির ছবি ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন
এদিকে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রেলের মহাপরিচালকের (ডিজি) প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও তার ছবি ব্যবহার করে বিতর্ক উসকে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রশ্ন, কোনো বিষয়ে ডিজির সংশ্লিষ্টতা বা সম্পৃক্ততার প্রমাণ না থাকলে প্রতিবেদনে তার ছবি ব্যবহার করে তাকে বিতর্কের কেন্দ্রে আনার প্রয়োজন কেন? তাদের দাবি, এ ধরনের উপস্থাপনা জনমনে একটি নির্দিষ্ট ধারণা তৈরির উদ্দেশ্যে করা হয়ে থাকতে পারে।
তারা আরও অভিযোগ করেন, কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি এবং কথিত সাংবাদিকতার আড়ালে থাকা কিছু মহল যাচাই-বাছাই ছাড়া এমন অভিযোগ প্রচার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে। তবে নথি ও বাস্তব তথ্য সামনে এলে এ ধরনের প্রচারণা টিকবে না বলেও তারা দাবি করেন।