বহিষ্কৃত এসআই’র নেতৃত্বে ‘কিডন্যাপ সিন্ডিকেট’, র‌্যাবের হাতে ধরা

মুক্তিপণ দেয়ার পরও মেলে না মুক্তি, স্বামীর হাত-মুখ বেঁধে তারই সামনে লুণ্ঠিত হয় স্ত্রীর সম্ভ্রম! পর্যটন শহর কক্সবাজারে এমন এক ভয়ংকর অপহরণকারী সিন্ডিকেটের সন্ধান পেয়েছে র‌্যাব। এসময় তাদের সুরক্ষিত গোপন আস্তানায় অভিযান চালিয়ে এক নারীসহ পাঁচ অপহৃত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে। এরই সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয় চক্রের মূলহোতা পুলিশের বহিষ্কৃত উপপরিদর্শক (এসআই) এসএম ইকবাল পারভেজসহ চক্রের তিন সদস্যকে। এদের মধ্যে রয়েছেন ইকবালের দুই শ্যালক।

শুক্রবার (১৯ মে) কক্সবাজার র‌্যাব ক্যাম্পের কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন শামীমের নেতৃত্বে র‌্যাবের একটি দল কক্সবাজার শহরের কলাতলী ও সুগন্ধা পয়েন্ট এলাকায় রাতভর অভিযান পরিচালনা করে।

র‌্যাব জানায়, গত ১৬ মে কক্সবাজার বেড়াতে এসে নিখোঁজ হন ঢাকার উত্তরার বাসিন্দা মো. শাহজাহান কবির ও মঞ্জুর আলম। পরে একটি মোবাইল নম্বর থেকে কল করে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরিবারের পক্ষ থেকে আংশিক মুক্তিপণ পরিশোধ করা হলেও মুক্তি মেলেনি শাহজাহান ও মঞ্জুরের।

অপহৃত আরেক দম্পতিকে অপহরণ করে দাবিকৃত মোটা অংকের টাকা না পেয়ে স্বামীর হাত-মুখ বেঁধে স্ত্রীকে একে একে ধর্ষণ করে চক্রের সদস্যরা। স্বামীর ওপর চালানো হয় মধ্যযুগীয় অমানবিক বর্বর নির্যাতন।

অপহৃত ব্যক্তিদের স্বজনরা বিকাশে দুই লক্ষাধিক টাকা মুক্তিপণ দিলেও তাদের ছাড়া হয়নি। অপহরণকারীদের দাবি আরও অনেক বেশি। বেদম মারধরের পাশাপাশি চাহিদামতো মুক্তিপণ না দিলে অপহৃতদের মেরে ফেলারও হুমকি দেয়া হয়। নিরুপায় হয়ে স্বজনরা বিষয়টি র‌্যাবকে অবহিত করলে গোয়েন্দা উপাত্ত ব্যবহার করে কাজ শুরু করেন তারা।

তারই ধারাবাহিকতায় কক্সবাজার শহরের কলাতলী ও সুগন্ধা পয়েন্ট এলাকায় এই সিন্ডিকেটের দুটি সুরক্ষিত ও গোপন আস্তানার সন্ধান পায় র‌্যাব। পরে এসব আস্তানায় রাতভর অভিযান পরিচালনা করে কলাতলী থেকে চক্রের দুই সদস্য এবং পরে তাদের দেয়া তথ্যানুযায়ী সুগন্ধা এলাকার অপর গোপন আস্তানায় অভিযান চালিয়ে চক্রের প্রধান, পুলিশের বহিষ্কৃত উপপরিদর্শক (এসআই) এসএম ইকবাল পারভেজকে গ্রেফতার করা হয়। সেই সঙ্গে উদ্ধার করে র‌্যাব হেফাজতে নিয়ে আসা হয় সেখানে জিম্মি থাকা পাঁচ নারী-পুরুষকেও।

উদ্ধারের পর র‌্যাব ও স্থানীয় জনতার সম্মুখেই স্বামী-স্ত্রী অভিযোগ করেন, তাদের আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের পাশাপাশি স্বামীর হাত-মুখ বেঁধে স্ত্রীকে ধর্ষণও করা হয়।

র‌্যাব জানায়, চক্রের প্রধান ইকবাল পারভেজ ২০২১ সালের ১৭ ডিসেম্বর পুলিশের এসআই হিসেবে কর্মরত অবস্থায় বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ র‌্যাবের হাতে ধরা পড়েন। ওই ঘটনায় দীর্ঘদিন কারাভোগের পাশাপাশি চাকরিও হারান তিনি। চাকরি থেকে বরখাস্ত ও কারাগার থেকে বের হওয়ার পর এসআই (বরখাস্তকৃত) ইকবাল তার শ্যালক মুন্নাসহ অন্য ৭-৮ জন সহযোগী নিয়ে গড়ে তোলেন অপহরণ বাণিজ্যের রমরমা এই সিন্ডিকেট।

চক্রের সদস্যরা দেশের নানাপ্রান্ত থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা মানুষদের টার্গেট করে অপহরণ করে তাদের স্বজনদের নিকট ফোন করে মোটা অংকের মুক্তিপণ দাবি করতো।

র‌্যাবের অভিযানে গ্রেফতারকৃত অপহরণকারী চক্রের মূল হোতা এসএম ইকবাল পারভেজ (৪০) চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলাধীন মাইতুল সরকারবাড়ি এলাকার মৃত এরশাদ আলমের ছেলে।

অন্যদিকে গ্রেফতারকৃত এমটি মুন্না (৩০) এবং মো. ইউসুফ, উভয়ের বাড়ি কক্সবাজার পৌরসভার ২নম্বর ওয়ার্ডস্থ নতুন বাহারছড়া এলাকায়।

শুক্রবার (১৯ মে) অপহরণের শিকার শাহজাহান কবিরের বোন মোছাম্মৎ আমেনা বেগম বাদী হয়ে গ্রেফতারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় একটি মামলা করেন। আসামি ও উদ্ধারকৃত ব্যক্তিদের পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থার জন্য কক্সবাজার সদর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কক্সবাজার র‌্যাব ক্যাম্পের কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন শামীম বলেন, কক্সবাজারকেন্দ্রিক অপহরণ-মুক্তিপণ সিন্ডিকেটের মূলোৎপাটনের লক্ষ্যে র‌্যাবের যে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, তারই অংশ হিসেবে আমরা এই অভিযান পরিচালনা করেছি।

তিনি বলেন, গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি, তদন্তের স্বার্থে যা এখনই প্রকাশ করা যাচ্ছে না। এ চক্রের অপরাপর সদস্যদেরও শিগগিরই আইনের আওতায় আনা হবে।