রেলে ‘ব্র্যান্ডের’ আড়ালে নকল যন্ত্রাংশের কারবার!

যাত্রীসেবাকে নিরাপদ, আরামদায়ক ও নিরবচ্ছিন্ন করতে সরকার যখন রেলওয়ের আধুনিকায়নে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে, তখন সেই রেলের ভেতরেই ‘ব্র্যান্ডেড’ যন্ত্রাংশের নামে নিম্নমানের ও সন্দেহজনক উৎসের পণ্য সরবরাহ করে রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী কারখানার ক্যারেজ ইনচার্ মোহাম্মদ উল্লাহ’র চত্রছায়ায় রেলের যন্ত্রাংশ সরবরাহের একটি প্রভাবশালী চক্র। বাজারে কয়েক হাজার টাকায় পাওয়া যায়—এমন যন্ত্রাংশ বিদেশি ব্র্যান্ডের লেবেল সাঁটিয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে বিল করার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, গুরুত্বপূর্ণ রেলযন্ত্রাংশে এমন অনিয়ম চলতে থাকলে শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থই নয়, ঝুঁকিতে পড়তে পারে হাজারো যাত্রীর নিরাপত্তাও।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব অনিয়মের ফলে একদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে ট্রেনের নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। সূত্র জানায়, আহসানুল এন্টারপ্রাইজের নামে মো. আলমগীর পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের জন্য ৫০০টি বিদেশি মানসম্পন্ন ‘শক অ্যাবজর্বার’ সরবরাহের কার্যাদেশ পান। কার্যাদেশ পাওয়ার পর চট্টগ্রামের পাহাড়তলী কারখানায় এসব যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা হয়।

তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একাধিক অভিজ্ঞ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, সরবরাহ করা শক অ্যাবজর্বারের গায়ে ভারতের ‘আশা কর্পোরেশন’-এর লেবেল থাকলেও পণ্যগুলোর প্রকৃত উৎপত্তি ও মান নিয়ে তাদের সন্দেহ রয়েছে। তাদের দাবি, যন্ত্রাংশগুলো ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের তৈরি কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এগুলো নিম্নমানের দেশীয় কাঁচামাল দিয়ে তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে বলে তারা মন্তব্য করেন।

তাদের ভাষ্য, বিদেশি ব্র্যান্ডের নামে সরবরাহ করা যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, উৎস, মান নিয়ন্ত্রণ সনদ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে রেলওয়ের মতো জননিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে যন্ত্রাংশের মান নিয়ে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ থাকা উচিত নয়।

৭-৮ হাজার টাকার যন্ত্রাংশ, বিল ৬০ হাজার!’

অভিযোগ রয়েছে, বাজারে তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়—এমন যন্ত্রাংশ বিদেশি ব্র্যান্ডের লেবেল ব্যবহার করে অনেক বেশি দামে বিল দেখানো হতে পারে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, একটি নিম্নমানের শক অ্যাবজর্বার ৭ থেকে ৮ হাজার টাকায় পাওয়া সম্ভব হলেও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পণ্য হিসেবে প্রায় ৬০ হাজার টাকা করে বিল দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

সিডিউলে ব্র্যান্ডেড পণ্য, সরবরাহে নিম্নমানের মাল

সূত্রগুলো আরও দাবি করে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিডিউলে নির্ধারিত মানের সীমিতসংখ্যক মালামাল সরবরাহ করে বাকি অংশে নিম্নমানের পণ্য দেওয়া হয়। অভিযোগ আছে, সরবরাহ প্রক্রিয়ায় জড়িত ক্যারেজ ইনচার্জ এবং কিছু ঠিকাদারের যোগসাজশে এমন অনিয়ম সংঘটিত হচ্ছে।

ঠিকাদারদের দাবি, ‘কমিশনেই শেষ ১০-১২ শতাংশ টাকা’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ঠিকাদারও দাবি করেন, রেলওয়ের বিভিন্ন সরবরাহকাজে কমিশন ও অন্যান্য অনৈতিক খরচের চাপ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, এ ধরনের ব্যয় বহন করতে গিয়ে কোনো কোনো ঠিকাদার নিম্নমানের পণ্য সরবরাহে উৎসাহিত হতে পারেন।

বিদেশি প্রতিষ্ঠানের লেবেল সাঁটানো পণ্যের প্রকৃত উৎস নিয়ে প্রশ্ন

পাহাড়তলীতে সরবরাহ করা শক অ্যাবজর্বারের মান ও মূল্য যাচাইয়ের দাবি।অভিযোগের তীর পাহাড়তলী কারখানার সংশ্লিষ্ট কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার দিকেও উঠেছে। সূত্রের দাবি, সরবরাহকৃত যন্ত্রাংশ গ্রহণ ও মান যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে ক্যারেজ বিভাগে ইনচার্জ মোহাম্মদ উল্লাহ’র অনিয়মে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

রেলসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, ট্রেনের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত যন্ত্রাংশের মান নির্ধারিত মানের না হলে তা যাত্রীদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। শক অ্যাবজর্বারসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ নির্ধারিত মান অনুযায়ী না হলে ট্রেনের যান্ত্রিক সক্ষমতা ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যদিও নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহারের কারণেই নির্দিষ্ট কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে—এমন প্রমাণ এই প্রতিবেদনের হাতে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঠিকাদার মো. আলমগীর প্রথমে সরবরাহ করা যন্ত্রাংশ ভারতীয় বলে দাবি করেন। পরে ‘আশা কর্পোরেশন’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত কাগজপত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই প্রতিষ্ঠানকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না এবং দেশের একটি এজেন্টের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করেছেন। জাতীয়তাবাদী রেল শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, জনগণের স্বার্থে রেলওয়ের সব ধরনের অনিয়মদুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজনঅভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, ঠিকাদার মো. আলমগীরের স্ত্রী রোজিনা আকন্দ রেলওয়ের অ্যাকাউন্টস শাখায় কর্মরত রয়েছেন। এ কারণে স্বার্থের সংঘাত বা প্রভাব বিস্তারের কোনো সুযোগ তৈরি হয়েছে কি না, সেটিও যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। রেলওয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে যন্ত্রাংশ ক্রয়সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, প্রতিটি সরবরাহ করা পণ্যের উৎপত্তি, মান, ব্র্যান্ডের সত্যতা, মূল্য এবং গ্রহণপ্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।

 

অভিযোগগুলো সত্য হলে শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ই নয়, যাত্রীনিরাপত্তার ক্ষেত্রেও তা গুরুতর হুমকি তৈরি করতে পারে। তাই অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কর্মচারী ও ঠিকাদারদের ভূমিকা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন রেলসংশ্লিষ্টরা।